ইউরোপের প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাসের এক রহস্যময় ও গা ছমছমে ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। স্লোভাকিয়ায় প্রায় ৭ হাজার বছর পুরনো এক প্রাচীন বসতিতে প্রায় ৮০টি মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে, যার সবকটিই ছিল মাথা ছাড়া।
ভ্রাবলে বসতির রহস্য
মধ্য ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম নব্যপ্রস্তরযুগীয় খামার এলাকা ‘ভ্রাবলে’ বসতির চারপাশ ঘিরে থাকা একটি পরিখা বা ড্রেন থেকে এই অবশিষ্টাংশগুলো উদ্ধার করা হয়। গবেষকরা সেখানে অন্তত ৭৮টি কঙ্কাল শনাক্ত করতে পেরেছেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, কেবল একটিমাত্র শিশুর কঙ্কালের মাথা অক্ষত ছিল, বাকি সবকটি দেহাংশই ছিল মুণ্ডহীন।
হত্যাকাণ্ড নাকি পরিকল্পিত আচার?
এই আবিষ্কার দীর্ঘদিন ধরে বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। প্রাথমিক অবস্থায় ধারণা করা হয়েছিল, এই মানুষগুলো হয়তো কোনো ভয়াবহ সহিংস আক্রমণ বা গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মৃত্যুর পর কোনো পরিকল্পিত আচারের বা রীতির অংশ হিসেবে তাদের মাথাগুলো শরীর থেকে আলাদা করা হয়েছিল।
জার্মানির কিল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের মতে, এই মানুষগুলো যে কোনো সহিংস যুদ্ধের কারণে মারা গেছেন—এমন প্রমাণ খুব একটা নেই। কঙ্কালগুলো যেভাবে নিখুঁত ও যত্নসহকারে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, তা দেখে মনে হয় এই কাজটি এমন কেউ করেছিলেন যার মানব শারীরস্থান বা অ্যানাটমি সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। হাড়ের গায়ে কাটার দাগ এবং কঙ্কালগুলোর সুবিন্যস্ত অবস্থান কোনো বিশৃঙ্খল যুদ্ধের দিকে নয়, বরং একটি পূর্বপরিকল্পিত রীতির প্রতিই ইঙ্গিত করে।
নিখোঁজ মাথার রহস্য
এই ঘটনার সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো, নিখোঁজ মাথা বা খুলিগুলোর একটিরও সন্ধান মেলেনি ওই এলাকায়। গবেষকদের ধারণা, এই প্রারম্ভিক কৃষিভিত্তিক সমাজের মানুষের ধর্মীয় বা সামাজিক বিশ্বাসে মানুষের মাথার হয়তো বিশেষ কোনো প্রতীকী বা আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ছিল। যার কারণে মাথাগুলো অন্য কোথাও সংরক্ষণ বা ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
কঙ্কালগুলোকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া গেছে; কিছু কঙ্কাল উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা অবস্থায় এবং কিছু জোড়ায় জোড়ায় রাখা ছিল। গবেষকরা বলছেন, এই আবিষ্কার প্রস্তর যুগের ইউরোপের মৃত্যু ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের চেনা ধারণাকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
যদিও এই মুণ্ডচ্ছেদের পেছনের আসল কারণটি এখনো উন্মোচিত হয়নি, তবুও এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি ইউরোপের প্রাথমিক বসতি স্থাপনকারীদের জটিল সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতির এক বিরল আভাস দিচ্ছে। আপাতত, দূর অতীতের এই রহস্য বুকে নিয়েই ঘুমিয়ে আছে ভ্রাবলের মাথাছাড়া কঙ্কালগুলো।
উল্লেখ্য, এই গবেষণাপত্রটি ‘প্রোসিডিংস অব দ্য প্রিহিস্টোরিক সোসাইটি’-তে প্রকাশিত হয়েছিল।



