হাম নিয়ে আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই মূল সমাধান: ডা. মারুফা রহমানের পরামর্শ
হাম নিয়ে আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই সমাধান: ডা. মারুফা রহমান

হাম নিয়ে আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই মূল সমাধান: ডা. মারুফা রহমানের পরামর্শ

সাম্প্রতিক সময়ে হাম নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক বাবা-মা মশার কামড়ের দাগকেও হাম ভেবে ডাক্তারের কাছে ছুটছেন। এই পরিস্থিতিতে হাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডা. মারুফা রহমান, মেডিকেল অফিসার, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, হামের কারণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

হাম কি এবং কীভাবে ছড়ায়?

হাম বা Measles একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা দেখতে নিরীহ মনে হলেও মারাত্মক হতে পারে। এটি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একসঙ্গে ১৬ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।

হামের প্রকোপ বাড়ার প্রধান কারণ

বিশ্বব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ দায়ী:

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়া: অনেক এলাকায় টিকা কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
  • কোভিড-১৯ সময় টিকাদান ব্যাহত হওয়া: মহামারীর সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে।
  • শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বৃদ্ধি: অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
  • টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা: অনেক অভিভাবক টিকার নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান থাকেন।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৫০% এর বেশি আক্রান্ত শিশু এখনও টিকার আওতায় আসেনি। হামের টিকা সাধারণত ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়। এর আগে মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত অ্যান্টিবডি শিশুকে কিছু সুরক্ষা দেয়। কিন্তু ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণ হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  1. অনেক মা এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং করান না।
  2. অনেক মা নিজেও হামের টিকা পাননি।

প্রথম ৬ মাস শুধু মায়ের দুধই শিশুর জন্য পর্যাপ্ত, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু ফর্মুলা ফিড বা গরুর দুধ দেওয়া হলে শিশু প্রাকৃতিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়।

টিকা নেওয়ার পরও হাম কেন হয়?

অনেক অভিভাবক প্রশ্ন করেন, "টিকা দেওয়া সত্ত্বেও হাম কেন হয়?" এ বিষয়ে ডা. মারুফা রহমান স্পষ্ট করেন:

  • ভ্যাকসিন কখনো ১০০% নিশ্চয়তা দেয় না যে রোগ হবে না।
  • তবে ভ্যাকসিন নিশ্চিতভাবে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

অর্থাৎ, ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ রক্ষা না করলেও মারাত্মক জটিলতা যেমন নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, চোখের কর্নিয়া ক্ষতি ও অন্ধত্ব থেকে শিশুকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

অপুষ্টি ও হামের সম্পর্ক

অপুষ্টি হামের জটিলতা বাড়ানোর একটি বড় কারণ। অপুষ্টিগ্রস্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে, ফলে হাম দ্রুত গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। আবার হাম আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর খাওয়ার রুচি কমে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, যা অপুষ্টি আরও বাড়িয়ে তোলে। এই চক্র ভাঙতে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।

হাম প্রতিরোধ ও আক্রান্ত হলে করণীয়

হাম প্রতিরোধে তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা আবশ্যক:

  1. সময়মতো টিকা: ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া উচিত।
  2. মায়ের দুধ: প্রথম ৬ মাস এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং নিশ্চিত করুন।
  3. পুষ্টিকর খাবার: ডিম, ডাল, শাকসবজি, পর্যাপ্ত পানি পান করান।

হাম আক্রান্ত হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করুন:

  • শিশুকে আলাদা রাখুন (আইসোলেশন) সংক্রমণ ছড়ানো রোধ করতে।
  • পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিন।
  • ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট প্রদান করুন।
  • জ্বর বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শেষ কথা

হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়, কিন্তু এটি সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের শিশুদের এই মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করা সম্ভব। ডা. মারুফা রহমানের মতে, "টিকা, মায়ের দুধ ও সুষম খাবার—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা শিশুদের বড় ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে পারি।" অভিভাবকদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ অনুসরণ করা।