সম্প্রতি বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হাম বা মিজেলসের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ নয়, বরং সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা না নিলে এটি শিশুর জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হাম সম্পর্কে অভিভাবকদের মনে উঁকি দেওয়া সাধারণ কিছু প্রশ্ন এবং এর কার্যকর সমাধান নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
হামের প্রাথমিক লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য
হামের শুরু সাধারণত উচ্চমাত্রার জ্বর দিয়ে হয়। এর সঙ্গে দেখা দেয় অবিরাম কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং নাক দিয়ে পানি পড়ার সমস্যা। জ্বর শুরুর প্রায় চার দিন পর কান বা গলার নিচ থেকে লালচে র্যাশ বা দানা বের হতে শুরু করে, যা দ্রুত মুখমণ্ডল হয়ে সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হাম কতটা সংক্রামক এবং এর সম্ভাব্য জটিলতা
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাল রোগ, যা প্রধানত শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে পরবর্তীতে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, কান পাকা, মুখে ঘা এবং এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব দেখা দিলে চোখের শুষ্কতা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে।
জ্বর ও র্যাশ মানেই কি হাম?
জ্বরের সঙ্গে র্যাশ দেখা দিলে সেটি সবসময় হাম নয়। জার্মান হাম (রুবেলা), ভাইরাল একজ্যান্থেম, ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়াতেও অনুরূপ লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে উচ্চ জ্বর, চোখ লাল হওয়া এবং গলার নিচ থেকে র্যাশ শুরু হওয়া হামের শক্তিশালী ইঙ্গিত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া র্যাশ আক্রান্ত প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৮ জনই মূলত হামে আক্রান্ত।
হাম শনাক্তকরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী
হাম নিশ্চিত করতে IgM অ্যান্টিবডি টেস্ট এবং আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে মায়ের বুকের দুধ না পাওয়া শিশু, পাঁচ বছরের কম বয়সী টিকাবঞ্চিত শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু (বিশেষ করে ভিটামিন-এ এর অভাব), গর্ভবতী নারী, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার শিশু এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী শিশুরা।
আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যা ও জরুরি অবস্থা
হামে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের র্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন শিশুকে আইসোলেশনে রাখা, পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত তরল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশুর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি, চোখের মণি ঘোলাটে হওয়া বা মুখে গভীর ঘা দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া উচিত।
হামের চিকিৎসা ও ভিটামিন ‘এ’-এর ভূমিকা
হামের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণ উপশম এবং জটিলতা প্রতিরোধের উপর কেন্দ্রীভূত। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল, চুলকানির জন্য এন্টিহিস্টামিন দেওয়া হয়। বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল পরপর দুইদিন খাওয়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দৃষ্টি সমস্যা দেখা দিলে ১৪ দিন পর অতিরিক্ত একটি ক্যাপসুল দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
টিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর হাম হওয়ার প্রধান কারণ হলো অনেক শিশু এখনো ‘এমআর’ টিকা পায়নি বা সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেনি। রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে বাংলাদেশে বিশাল পরিসরে হাম-রুবেলা (MR) ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে, যার আওতায় ৬ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় ২ কোটির বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। আগে টিকা নেওয়া থাকলেও এই ক্যাম্পেইনে শিশুকে টিকা দেওয়া আবশ্যক।
গর্ভবতী নারী ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরামর্শ
গর্ভাবস্থায় হামের টিকা সাধারণত নিষিদ্ধ, কারণ এটি ভ্রূণের ক্ষতি করতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যাদের আগে হাম হয়নি বা টিকা নেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত নন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শে এমএমআর টিকা নেওয়া উচিত। হামের টিকা একটি ‘লাইভ ভ্যাকসিন’, তাই টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসককে স্বাস্থ্য অবস্থা জানানো জরুরি।
টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
হামের টিকা (এমআর/এমএমআর) নেওয়ার পর হালকা জ্বর, ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, সামান্য র্যাশ বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে, যা কয়েক দিনের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে সেরে যায়। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরল। টিকার সুফল এই সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তুলনায় অনেক বেশি।
লেখক: ডা. এএসএম মাহমুদুজ্জামান, সহকারী অধ্যাপক, শিশু বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ।



