হাম নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়েছে, কিন্তু আতঙ্কের পরিবর্তে সচেতনতাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। ডা. মারুফ রায়হান খানের লেখা এই নিবন্ধে হাম সম্পর্কে অভিভাবকদের জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
হাম কি এবং এটি কতটা ছোঁয়াচে?
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা বাতাস ও ড্রপলেটের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। ভাইরাসটি বাতাসে বা কোনো বস্তুর উপর প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণ দেখা দেয়।
প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী?
হামের লক্ষণ মনে রাখতে 3C পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়:
- কাশি (Cough): তীব্র কাশি
- সর্দি (Coryza): নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া
- চোখ ওঠা (Conjunctivitis): চোখ লাল হওয়া
এছাড়াও তীব্র জ্বর, মুখে বা গলায় অস্বস্তি, মুখের ভেতর সাদা দাগ (কপ্লিক স্পট) দেখা দেওয়া এবং ৩-৪ দিন পর শরীরে র্যাশ ছড়িয়ে পড়া অন্যতম লক্ষণ।
কে বেশি ঝুঁকিতে আছে?
পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু এবং গর্ভবতী নারীরা হামের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। গর্ভাবস্থায় হাম হলে গর্ভপাত বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি থাকে।
হামের সম্ভাব্য জটিলতাগুলো
হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন:
- নিউমোনিয়া (হামে মৃত্যুর প্রধান কারণ)
- কানে ইনফেকশন
- ডায়রিয়া
- অন্ধত্ব
- মস্তিষ্কে প্রদাহ (Encephalitis)
হাম হওয়ার ৭-১০ বছর পরও এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে, যা SSPE নামে পরিচিত।
হাম প্রতিরোধের উপায়
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ উপায় হলো টিকা নেওয়া। সরকারি রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে MR (Measles-Rubella) টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। বেসরকারিভাবে MMR (Measles-Mumps-Rubella) ভ্যাকসিনও পাওয়া যায়।
টিকা কখন দিতে হয়?
শিশুদের সাধারণত ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিতে হয়। বাংলাদেশ সরকারের EPI শিডিউলে এটি অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ পরিস্থিতিতে ৬ মাস বয়সি শিশুদেরও টিকা দেওয়া হতে পারে।
টিকা সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন
টিকা কেন ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়? জন্মের সময় শিশু মায়ের কাছ থেকে প্রাকৃতিক অ্যান্টিবডি পায়, যা প্রথম কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়।
দ্বিতীয় ডোজ কেন প্রয়োজন? প্রথম ডোজ ৮৫-৯০% সুরক্ষা দেয়, বাকি ঝুঁকি কমাতে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
টিকা দেওয়ার পরও হাম হতে পারে? হ্যাঁ, টিকা ৯০-৯৫% কার্যকর, তবে অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে হাম হতে পারে, কিন্তু জটিলতা কম হয়।
ভিটামিন-এ এর ভূমিকা
ভিটামিন এ হাম প্রতিরোধ করতে পারে না, কিন্তু হাম হলে চোখের জটিলতা কমাতে সাহায্য করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হামের পর ভিটামিন এ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
আক্রান্ত শিশুর যত্ন নেওয়ার পদ্ধতি
হাম আক্রান্ত শিশুকে প্রচুর পানি ও তরল খাবার দিতে হবে। গোসল করানো ও স্বাভাবিক খাবার দেওয়া উচিত, কোনো নিষেধাজ্ঞা ভুল। র্যাশ থাকা অবস্থায় শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং বারবার হাত ধোয়া জরুরি।
কখন হাসপাতালে নিতে হবে?
- শ্বাসকষ্ট হলে
- খিঁচুনি দেখা দিলে
- বারবার বমি হলে
- প্রস্রাব কমে গেলে
- শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়লে
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব, তবে জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
একবার হাম হলে আবার হতে পারে?
একবার হাম হলে শরীরে আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে, তাই দ্বিতীয়বার হবার সম্ভাবনা খুবই কম। সমাজের ৯৫% মানুষ টিকা নিলে হামের বিস্তার বন্ধ করা যায়, যা হার্ড ইমিউনিটি নামে পরিচিত।
লেখক: ডা. মারুফ রায়হান খান, ৩৯তম বিসিএসের চিকিৎসক, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।



