হাম ভাইরাস: শিশুদের জন্য এক ভয়ংকর হুমকি
হাজার বছর আগের এক গ্রামের শিশুর গায়ে হালকা জ্বর দেখা দিল। মা ভাবলেন, সাধারণ সর্দি-কাশি। কিন্তু দুদিনের মধ্যে শিশুর চোখ লাল হয়ে উঠল, শুরু হলো প্রচণ্ড কাশি। গালের ভেতরে লবণের দানার মতো ছোট ছোট চিহ্ন দেখা দিল, যা দ্রুত কানের পেছন থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। শিশুর শরীর ভরে গেল লাল ফুসকুড়িতে। গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়াল, কারণ সবাই জানত, এই লাল দানব একবার ধরলে রক্ষা নেই।
হাম ভাইরাসের উৎপত্তি ও বিবর্তন
আজকের আলোচিত হাম বা মিজলস ইতিহাসের সেই লাল দানব। হামের ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম মিজলস মরবিলিভাইরাস। এটি প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের সদস্য। তবে এই ভাইরাস চিরকাল মানুষের ছিল না। এটি মূলত একটি জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ অন্য প্রাণী থেকে মানুষের দেহে এসেছে।
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, গরুর মধ্যে রিন্ডারপেস্ট নামে মহামারি চলত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, গরুর সেই ভাইরাস বিবর্তিত হয়ে মানুষের শরীরে জায়গা করে নিয়েছে। মিজলস মরবিলিভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস, যা ভাইরাসের ব্লু-প্রিন্ট হিসেবে কাজ করে এবং মানুষের শরীরে লাখ লাখ কপি তৈরি করতে পারে।
প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক আবিষ্কার
দশম শতাব্দীর পারস্যের বিজ্ঞানী আল-রাজি প্রথম লক্ষ্য করেন, গুটিবসন্ত ও হাম ভিন্ন রোগ। এরপর কয়েক শতাব্দী ধরে এই ভাইরাস জাহাজে চড়ে ইউরোপ থেকে আমেরিকায় ছড়িয়ে আদিবাসীদের বিপর্যস্ত করে। ভাইরাসটি এতই ছোঁয়াচে যে আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর ছাড়ার ২ ঘণ্টা পরও বাতাসে ভেসে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে।
১৮৪৬ সালে ফারো আইল্যান্ডে এক যাত্রীর মাধ্যমে হাম ছড়িয়ে পড়ে। ডাক্তার পিটার প্যানাম লক্ষ্য করেন, যারা আগে হামে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গিয়েছিল, তারা এবার সুস্থ। এই পর্যবেক্ষণ থেকে লাইফটাইম ইমিউনিটির ধারণা জন্মায়, যা পরে টিকার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
টিকা আবিষ্কারের যুগান্তকারী অধ্যায়
১৯৫৪ সালে হার্ভার্ডের ল্যাবরেটরিতে জন এন্ডার্স ও থমাস পিবলস ভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পোষ মানাতে সক্ষম হন। কিন্তু আসল চমক আসে মরিস হিলম্যানের হাত ধরে। ১৯৬৩ সালে তার মেয়ে হামে আক্রান্ত হলে, তিনি ভাইরাস নমুনা নিয়ে ল্যাবে দুর্বল করতে শুরু করেন।
হিলম্যান ভাইরাসকে মুরগির ভ্রূণের কোষে বারবার কালচার করেন। প্রায় ৪০ বার স্থানান্তরের পর ভাইরাস তার হিংস্রতা হারায়। এই দুর্বল ভাইরাসই আজকের লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড ভ্যাকসিন। টিকা দেওয়া হলে শরীর অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে আসল ভাইরাসকে ধ্বংস করে।
হামের লক্ষণ ও শিশুদের ঝুঁকি
হাম ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ফুসফুসে ঢুকে রক্তে ছড়ায়। সাধারণ জ্বরের ছদ্মবেশে আসে, তারপর গালে কপলিক স্পট দেখা দেয়। সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি ওঠে। সঠিক যত্ন না পেলে এই ভাইরাস শিশুর মস্তিষ্ক বা ফুসফুসকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, হামের টিকা দুই ডোজে দেওয়া হয়: প্রথম ডোজ ৯ মাসে, দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। টিকা দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ও হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করে।
আধুনিক চ্যালেঞ্জ ও সচেতনতা
একবিংশ শতাব্দীতেও হামের প্রকোপ দেখা যায়। ভ্যাকসিন হেজিটেন্সি, টিকা নিয়ে ভুল ধারণা, ভিটামিন এ-এর অভাব, এবং দুর্গম এলাকায় টিকা বিতরণের সমস্যা এর প্রধান কারণ। সচেতনতা না বাড়লে এই ভাইরাস আবার মাথাচাড়া দিতে পারে।
হাম শুধু সাধারণ অসুখ নয়, মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিটি শিশুকে সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যে বিশ্বাস রাখা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব।



