হামে আক্রান্ত শিশুর জন্য পুষ্টি নির্দেশিকা: কী খাওয়াবেন, কী এড়াবেন
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ যা প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করে, তবে যেকোনো বয়সের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারেন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে হামে শিশুমৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। হামের ভাইরাস শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায় এবং এর অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো শরীরে লাল ফুসকুড়ির আবির্ভাব। সাধারণত সংক্রমণের প্রায় ১৪ দিন পর উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে, যা প্রথমে মাথা থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন আগে থেকে এবং চার দিন পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের জন্য সংক্রামক হিসেবে বিবেচিত হয়।
হামের সাধারণ উপসর্গসমূহ
হামে আক্রান্ত হলে শিশুদের মধ্যে নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে:
- উচ্চ মাত্রার জ্বর যা কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে
- নাক থেকে ক্রমাগত পানি পড়া এবং অবিরাম কাশি
- চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পানি পড়া
- শরীরে চ্যাপ্টা লাল ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া, যা পরে একত্রিত হয়ে উঁচু আকার ধারণ করতে পারে
হামে আক্রান্ত শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা
হাম থেকে দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য শিশুর সুষম খাদ্য ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম অপরিহার্য। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিতে পারে, তাই কমলা, লেবু ইত্যাদি ফলের রস দেওয়া যেতে পারে যা রুচি বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে পুষ্টিকর খাবার যুক্ত করতে হবে।
পর্যাপ্ত তরল খাবারের গুরুত্ব
পানিশূন্যতা রোধ করতে শিশুকে প্রচুর পরিমাণে পানি, স্যুপ, তাজা ফলের রস এবং কুসুম গরম তরল খাবার প্রদান করা উচিত। এই তরল পদার্থগুলো শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বের করে দিতে সহায়তা করে এবং জ্বরের সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার
হামের তীব্রতা কমাতে ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাজর, মিষ্টি আলু, পালংশাক এবং ব্রকলির মতো সবজি খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, কারণ এগুলো প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ।
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার
শরীরের টিস্যু পুনরুদ্ধার এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে প্রোটিন অত্যাবশ্যক। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের বীজ জাতীয় খাবার শিশুকে নিয়মিত খাওয়ানো প্রয়োজন।
জিংকসমৃদ্ধ খাবার
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে সক্রিয় করতে জিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লাল মাংস, মুরগি, শিম, বাদাম এবং পূর্ণ শস্য যেমন ওটস বা ব্রাউন রাইস জিংকের উৎকৃষ্ট উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ খাবার
ভিটামিন ‘সি’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং দ্রুত সুস্থতায় ভূমিকা রাখে। লেবুজাতীয় ফল, স্ট্রবেরি, ক্যাপসিকাম এবং কিউই ফল খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি
হামের সময় শিশুকে কিছু নির্দিষ্ট খাবার থেকে দূরে রাখা উচিত, কারণ এগুলো অবস্থা আরও খারাপ করতে পারে:
- চিনিযুক্ত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার যা প্রদাহ বাড়াতে পারে
- অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত এবং ভাজাপোড়া খাবার যা হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে
- ঝাল খাবার যা গলা ও পেটে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে
- ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় যেমন চা বা কফি যা পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে
অতিরিক্ত সতর্কতা ও করণীয়
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর অবস্থা খারাপ হলে বা শ্বাসকষ্ট, তীব্র ডিহাইড্রেশন ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এছাড়া, খাদ্যতালিকা নিয়ে কোনো দ্বিধা বা প্রশ্ন থাকলে একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উপকারী হতে পারে, কারণ তারা ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী সঠিক নির্দেশনা দিতে পারেন।



