হামের প্রাদুর্ভাবে দেশজুড়ে উদ্বেগ: বিশেষজ্ঞরা টিকা গাফিলতিকে দায়ী করছেন
শিশুদের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের গাফিলতি ও অবহেলার কারণে সারা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দ্রুত টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগেই জনসচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন।
হাম কীভাবে ছড়ায় এবং কারা বেশি আক্রান্ত হয়?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ যা হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ জন বা তার চেয়েও বেশি শিশু সংক্রমিত হতে পারে। সাধারণত শূন্য থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। রাজধানীর বস্তি এলাকা ও উত্তরবঙ্গে ব্যাপকভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
হাসপাতালে ভর্তির হার ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. শ্রেবাশ পল গণমাধ্যমকে জানান, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই ৫৬০ জন হাম রোগী ভর্তি হয়েছে, যেখানে গত পুরো বছরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯। মার্চ মাসে হঠাৎ করে ভর্তির সংখ্যা বেড়ে ৫৬০-এ পৌঁছেছে। আগের বছরগুলোতে পরীক্ষিত নমুনার প্রায় ১০ শতাংশ পজিটিভ পাওয়া গেলেও এ বছর প্রায় ৯০ শতাংশ নমুনাই পজিটিভ এসেছে।
টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি ও তার প্রভাব
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় একটি শিশু জন্মের পর দুই ধাপে হামের টিকা পায়। প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে ও দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। অনেক শিশু প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে আসে না, ফলে সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। করোনা মহামারির সময় টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ২০২০ সালে ১০ ভাগের বেশি শিশু হাম রুবেলা টিকার আওতার বাইরে ছিল।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও দায়বদ্ধতা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "হামে শিশুমৃত্যু পরোক্ষ পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড। এই দায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিতে হবে, কারণ সে সময় শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়নি।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে রাজনৈতিক টানাপড়েন ও সরকারি উদাসীনতার কারণে ২০২৪ সালে প্রয়োজনীয় টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায়নি।
হামের লক্ষণ ও সম্ভাব্য জটিলতা
হামে আক্রান্ত হলে শিশুর মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
- জ্বর, সর্দি ও কাশি
- মুখের ভেতরে ছোট ছোট দাগ
- চোখ লাল হওয়া
- শরীরে ফুসকুড়ি
কোনো জটিলতা না থাকলে সাধারণত সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে রোগ সেরে যায়। তবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ব্রেন ইনফেকশন ও মৃত্যুও ঘটতে পারে।
উত্তরবঙ্গে সংক্রমণের উচ্চ হার ও পুষ্টিহীনতার ভূমিকা
উত্তরবঙ্গে হামের সংক্রমণ বেশি হওয়ার পেছনে শিশুদের পুষ্টিহীনতাকে দায়ী করা হচ্ছে। রাজশাহী অঞ্চলের শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, যেখানে পরীক্ষিত নমুনার ৩১ ভাগ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। ঢাকার বস্তি এলাকার শিশুদের মধ্যেও একই অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সরকার হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিচ্ছে:
- আক্রান্ত এলাকায় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো
- রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরের হাসপাতাগুলো প্রস্তুত রাখা
- আইসিইউ ভেন্টিলেশনের সংখ্যা বাড়ানো
- প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সোমবার (৩১ মার্চ) জানিয়েছেন যে এই উদ্দেশ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।



