হামে আক্রান্ত শিশুদের স্থায়ী জটিলতার ঝুঁকি, স্বাস্থ্য বিভাগের নীরবতা
হামে শিশুদের স্থায়ী জটিলতা, স্বাস্থ্য বিভাগ নীরব

দেশে এ সময়ে এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে শিশুর হাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মোটাদাগে পাঁচ ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। এসব জটিলতায় মৃত্যুও হয়। অন্যদিকে শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, হাম শিশুস্বাস্থ্যের বড় ক্ষতি করে, কিছু ক্ষতি স্থায়ী হওয়ার ঝুঁকিও আছে।

হামের জটিলতা ও ঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগবিষয়ক বিস্তৃত বর্ণনায় হাম সম্পর্কে বলা হয়েছে, হামে আক্রান্ত হলে দৃষ্টি ক্ষীণ হতে পারে, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, কানে সংক্রমণ হয়, নিউমোনিয়াসহ তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া এনকেফালাইটিস দেখা দেয়, যার কারণে মস্তিষ্কে প্রদাহ হয়। এতে মস্তিষ্কে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

প্রতিদিন হামে আক্রান্ত, মৃত্যু ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার তথ্য দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এ পর্যন্ত হামে ২৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু হামে আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক শিশুর শারীরিক পরিস্থিতি কী, তা জানা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য বিভাগও জানার উদ্যোগ নেয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাস্তব উদাহরণ

দক্ষিণের জেলা বরগুনা শহরের কলি বেগম তাঁর ১০ মাসের ছেলে আবদুলকে নিয়ে এখন ঢাকা শহরে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকছেন। তাঁর হামে আক্রান্ত ছেলে এ মাসের ৪ থেকে ২৩ তারিখ মিরপুর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছেন, ছেলে হাম থেকে মুক্ত। কলি বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ছেলে সর্দিজ্বরে আক্রান্ত হয় মার্চের প্রথম সপ্তাহে। তিন দফায় ছেলের চিকিৎসা হয় বরগুনা সদর হাসপাতালে, এরপর চিকিৎসা হয় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছেলে সুস্থ না হওয়ায় কলি বেগম তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। কলি বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলে এখনো ভালোভাবে শ্বাস নিতে পারে না, কষ্ট হয়। ছেলের মুখে হাসি নেই। সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে বরগুনায় ফিরে যাব না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজধানী জুরাইনের হারুন আল রশীদের যমজ দুই সন্তান জাবিয়ান ও জাহিয়ান প্রায় দুই মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে দুদিন আগে বাসায় ফিরেছে। শিশু দুটির বয়স এখন আট মাস। ছয় মাস বয়সে তারা হামে আক্রান্ত হয়। হারুন আল রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওদের ওজন অনেক কমে গেছে। শরীরে নানা সমস্যা। আমরা বুঝে উঠতে পারছি না কী করব।’

স্বাস্থ্য বিভাগের নীরবতা

হাম ভালো হওয়ার পর শিশুরা অন্য কোনো জটিলতায় পড়ছে কি না, তা তলিয়ে দেখছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসার বাইরে আপাতত আমরা অন্য কিছু আর করছি না।’

ভিটামিন এ-এর গুরুত্ব

হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ কমে যায়। শরীরে ভিটামিন এ কমে গেলে চোখ শুকিয়ে যায়, এতে চোখের ক্ষতি হয়। শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ কমে যায়। শরীরে ভিটামিন এ কমে গেলে চোখ শুকিয়ে যায়, এতে চোখের ক্ষতি হয়।’ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভিটামিন এ-এর স্বল্পতার কারণে রাতকানা রোগ দেখা দেয়। যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, শরীরে ভিটামিন এ-এর ঘাটতি আছে তারা হামে আক্রান্ত হলে পরিস্থিতির অবনতি হয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীও হয়ে যায়।

দুর্বলদের বেশি আক্রান্ত

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের হাম হয়। যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা টিকা নেওয়ার পরও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি তাদের হামের ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছেন, হাম হওয়া শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, তাদের কান পাকে, অপুষ্টিতে ভোগে, অনেকের মুখের ভেতরের চোয়ালের অংশে ঘা হয়।

গর্ভধারণে ঝুঁকি

আবার গর্ভধারণ অবস্থায় হামে আক্রান্ত হলে তা মায়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অপরিণত সন্তান প্রসব হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে সন্তানের ওজন কম হয়।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থা

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অপুষ্ট শিশু হাসপাতালে এলেই তাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ খাওয়াতে হবে। মাকেও ভিটামিন এ খাওয়াতে হবে, যেন মায়ের দুধ থেকে শিশু ভিটামিন এ পায়। হামে আক্রান্ত দরিদ্র শিশুদের পরিবারকে স্থানীয় সরকার, স্থানীয় এনজিও বা সমাজকল্যাণ কর্মসূচি থেকে সহায়তা করতে হবে, যেন ওই পরিবারের অপুষ্টি দূর হয়। সার্বিকভাবে দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতিতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

হামের এসব স্থায়ী ক্ষতির বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই, স্বাস্থ্য বিভাগেও আলোচনা কম। মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করারও কোনো সরকারি প্রচেষ্টা নেই। এ ব্যাপারে নাগরিক উদ্যোগ বা বেসরকারি কর্মসূচিও চোখে পড়ে না।