অস্টিওআর্থ্রাইটিসের নতুন চিকিৎসা: কার্টিলেজ মেরামতে ইনজেকশন, আশার আলো দেখাচ্ছে গবেষণা
আমাদের শরীরের জয়েন্ট বা সংযোগস্থলে কার্টিলেজ নামের একটি নরম ও মসৃণ স্তর থাকে, যা হাঁটা, দৌড়ানো বা নড়াচড়াকে সহজ করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কার্টিলেজ ক্ষয় হতে থাকে, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী রোগ অস্টিওআর্থ্রাইটিস দেখা দেয়। এই রোগে জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, ফোলা বা শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হয়, যা জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন, এবং এখন পর্যন্ত এই রোগ পুরোপুরি সারানোর কোনো কার্যকরী উপায় আবিষ্কৃত হয়নি।
নতুন গবেষণা: ইনজেকশনের মাধ্যমে কার্টিলেজ পুনরুদ্ধার
যুক্তরাষ্ট্রের উইনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের একদল গবেষক একটি আশাব্যঞ্জক ইনজেকশন তৈরির কাজ করছেন, যা নষ্ট হয়ে যাওয়া কার্টিলেজকে আবার গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। এই ইনজেকশন শুধু কার্টিলেজ মেরামতই করে না, বরং শরীরের নিজস্ব কোষগুলোকে সক্রিয় করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে নিজ থেকে ঠিক করার চেষ্টা চালায়। গবেষণার নেতৃত্বে আছেন স্টিফেনি ব্র্যায়ান্ট, যিনি বলেন যে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তাঁরা একটি ‘অসম্ভব’ ধারণা থেকে বাস্তবে এসে পৌঁছেছেন। প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় এই পদ্ধতি অস্টিওআর্থ্রাইটিস উল্টো ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, যা চিকিৎসা জগতে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চিকিৎসার পদ্ধতি ও সম্ভাবনা
এই নতুন চিকিৎসায় একটি বিশেষ ওষুধ প্রয়োগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, যা জয়েন্টে ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে ওষুধ বের হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি, গবেষকেরা একটি ইনজেক্টেবল ‘ইমপ্ল্যান্ট’ নিয়েও কাজ করছেন, যা জয়েন্টে থেকে শরীরের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত কার্টিলেজ মেরামতে প্রভাবিত করে। অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চারটি ধাপ রয়েছে, যেখানে শুরুতে কার্টিলেজ একটু একটু করে কমে এবং শেষ ধাপে এসে কার্টিলেজ পুরোপুরি হারিয়ে গেলে হাড়ের সঙ্গে হাড় ঘষা খায়, ফলে ব্যথা ও চলাফেরার কষ্ট অনেক বেড়ে যায়।
ইভালিন বারগার নামের আরেক গবেষক উল্লেখ করেন যে বর্তমান চিকিৎসায় রোগীদের হয় বড় অপারেশন করতে হয়, নয়তো শুধু ব্যথা সহ্য করতে হয়, কিন্তু এই নতুন গবেষণা এর ‘মাঝখানের সমাধান’ হতে পারে। তবে এখনো এটি মানুষের ওপর পরীক্ষা করা হয়নি; প্রথম ধাপের পরীক্ষা প্রাণীর ওপর সফল হয়েছে। গবেষকেরা এখন নিরাপত্তা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আরও পরীক্ষা করবেন, এবং সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দেড় বছরের মধ্যে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হতে পারে।
অন্যান্য গবেষণা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রোটিন খুঁজে পেয়েছেন, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে কার্টিলেজ কমে যাওয়ার জন্য দায়ী। এই প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ভবিষ্যতে জয়েন্টের ক্ষয় ঠেকানো সম্ভব হতে পারে। এ ছাড়া, ডায়াবেটিসের ওষুধে ব্যবহৃত সেমাগ্লুটাইড নামের একটি উপাদানও কার্টিলেজ ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে, এমন ধারণাও গবেষণায় পাওয়া গেছে।
তবে যত নতুন চিকিৎসাই আসুক, কিছু সাধারণ অভ্যাস এখনই আমাদের সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পেশি শক্ত হয়, ফলে জয়েন্টের ওপর চাপ কমে। আর নড়াচড়া করলে জয়েন্টে পুষ্টিকর তরলের চলাচল বাড়ে, যা কার্টিলেজকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। অস্টিওআর্থ্রাইটিস নিয়ে গবেষণা এখনো শুরুর পর্যায়ে রয়েছে, কিন্তু আশা করা যায় যে শীঘ্রই এমন চিকিৎসা পাওয়া যাবে, যেখানে শুধু ব্যথা কমানো না, বরং রোগটিই পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে।



