পুরুষদের জন্য হরমোনবিহীন সাময়িক গর্ভনিরোধক উদ্ভাবন
জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত পদ্ধতিগুলো দীর্ঘকাল ধরে মূলত নারীদের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। পুরুষদের জন্য কন্ডোম বা স্থায়ী অস্ত্রোপচার ছাড়া অন্য কোনো কার্যকরী বিকল্পের অভাব ছিল বলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এবার বিজ্ঞানীরা একটি যুগান্তকারী উদ্ভাবনের দাবি করেছেন, যা জন্ম নিয়ন্ত্রণে নারীদের ওপর পুরুষদের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে পারে।
গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালিয়ে পুরুষদের জন্য হরমোনবিহীন ও সাময়িক গর্ভনিরোধক পদ্ধতি তৈরি করেছেন। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পুরুষের প্রজনন ক্ষমতায় স্থায়ী কোনো ক্ষতি করে না। সম্প্রতি বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ এই গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্যানসার গবেষণায় ব্যবহৃত ‘জেকিউ১’ নামের একটি যৌগ ব্যবহার করে শুক্রাণু উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা সম্ভব। গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর তিন সপ্তাহ ধরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখা গেছে, তাদের শুক্রাণু উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রয়োগ বন্ধ করার মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই ইঁদুরগুলো পুনরায় স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা ফিরে পায় এবং সুস্থ সবল শাবক জন্ম দিতে সক্ষম হয়।
কীভাবে কাজ করে এই পদ্ধতি?
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুরুষদেহে শুক্রাণু উৎপাদনের একটি নির্দিষ্ট ধাপ হলো ‘মায়োসিস’। এই ধাপে বাধা দিলে অস্থায়ীভাবে শুক্রাণু তৈরি বন্ধ করা যায়। ‘জেকিউ১’ যৌগটি শরীরের অন্য কোনো ক্ষতি না করে শুধুমাত্র শুক্রাণু উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। কর্নেল রিপ্রোডাক্টিভ সায়েন্সেস সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক পলা কোহেন এই বিষয়ে বলেন, ‘অণ্ডকোষে গর্ভনিরোধক প্রয়োগ যে কার্যকর হতে পারে, আমরাই তা প্রথম দেখালাম। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনে স্বাভাবিক মায়োসিস প্রক্রিয়া এবং শুক্রাণুর সম্পূর্ণ কার্যকারিতা ফিরে পাওয়া সম্ভব।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই প্রক্রিয়ায় গর্ভনিরোধক ব্যবহার করার পর কোনো পুরুষ চাইলে সফলভাবে সন্তান উৎপাদন করতে পারবেন। সন্তানের স্বাস্থ্যও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে।’ কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তারা শুক্রাণুর মূল কোষ বা স্টেম সেলগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কেবল উৎপাদন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পল কোহেন স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা স্পার্মাটোগোনিয়াল স্টেম সেলগুলিকে প্রভাবিত করতে চাইনি। কারণ, সেগুলিকে মেরে ফেললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলবেন।’
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও প্রভাব
এই উদ্ভাবিত পদ্ধতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, শুক্রাণু উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এটি প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন গবেষকরা। তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রতি কয়েক মাস পরপর প্রয়োগ করা যেতে পারে, যা সাময়িকভাবে প্রজনন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতি সফলভাবে মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা গেলে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এটি নারী-পুরুষের মধ্যে সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ভাগাভাগি করার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। পুরুষদের জন্য হরমোনবিহীন এই সাময়িক গর্ভনিরোধক পদ্ধতি চূড়ান্তভাবে কার্যকর প্রমাণিত হলে বিশ্বজুড়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির চিত্রই বদলে যেতে পারে।



