সংসদে হামের সংকট নিয়ে তীব্র বিতর্ক, শিশুমৃত্যু ও টিকার ঘাটতি উঠে এসেছে
জাতীয় সংসদের বুধবারের অধিবেশনে হামের সংকট নিয়ে জোরালো বিতর্ক হয়েছে। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা শিশুমৃত্যু, টিকার ঘাটতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতন এবং জনবল সংকটের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে তৈরি হওয়া শূন্যতা, টিকা পরিবহনকারীদের ৯ মাসের বেতন বকেয়া, বিভিন্ন জেলায় জনবল সংকট এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
রুমিন ফারহানার উদ্বেগ ও সমালোচনা
রুমিন ফারহানা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশে বলেন, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে হামের পুনরুত্থান একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একটি জনপদে হামের মহামারি রুখতে হলে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে দুই ডোজ এমআর (হাম–রুবেলা) টিকা দিতে হয়। তিনি উল্লেখ করেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই সুযোগ নিচ্ছে ভাইরাসটি।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নতুন করে টিকার অর্ডার দেওয়া হয়নি, এবং টিকা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা গত ৯ মাস ধরে বেতন পাননি। প্রায় ৩৫টি জেলায় টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘাটতি আছে। ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ ৭৯ শতাংশ বেড়েছে এবং বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ঢাকা, আশপাশের এলাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে বস্তি এলাকা এখন হামের হটস্পটে পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জবাব ও সরকারের পদক্ষেপ
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন রুমিন ফারহানার নোটিশের জবাবে বলেন, সংসদ সদস্যের উদ্বেগের অনেকটাই যৌক্তিক, তবে সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তিনি স্বীকার করেন, ভ্যাকসিনের ঘাটতি ছিল ঠিকই, তবে সরকার তা সামাল দিয়েছে। মজুত এখন ‘স্থিতিশীল’ অবস্থায় রয়েছে এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচিও শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এডিবির অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করে নতুন টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সারা দেশে কর্মসূচি চালু করা হবে। তিনি বলেন, ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মসূচি চালানো হবে। ৩ মে থেকে সারা দেশে এই কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও তা এগিয়ে আনা হয়েছে।
টিকা সরবরাহ ও বিতরণের তথ্য
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে টিকা বিতরণের হিসাব দেন। তাঁর ভাষ্য, উচ্চ সংক্রমণ এলাকাগুলোতে সর্বশেষ ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। প্রতি ভায়ালে ১০ ডোজ করে রয়েছে। আর হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের জন্য গ্যাভির মাধ্যমে সরকার প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও পরিবহনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী কোল্ড চেইন বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিঙ্গেল ডোজ ভায়াল থেকে মাল্টিডোজ ভায়ালে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সংরক্ষণ সহজ হয়। সরকারি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোভিডকালীন এডিবির মহামারি তহবিলের অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা হাম-রুবেলাসহ জরুরি টিকা কেনার জন্য পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক
সম্পূরক প্রশ্নে রুমিন ফারহানা বলেন, মন্ত্রী ‘অত্যন্ত সেনসিটিভ’ হয়ে গেছেন। তিনি হামে শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৯৮ জন শিশুর সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। তিনি একটি সংবাদপত্রের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, শুধু হাম নয়, ১০ রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে; ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে কয়েকটি টিকার মজুত শূন্য, কিছু টিকার মজুত জুন পর্যন্ত চলবে।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে ‘ক্রসচেক’ করা দরকার। তিনি দাবি করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ সমীক্ষায় এ পর্যন্ত ৪১ জনের মৃত্যু হামের কারণে নিশ্চিত হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে প্রথম শিশুমৃত্যুর পর তিনি কেঁদেছিলেন।
সরকারের প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে, সরকার ‘শূন্য’ মজুত থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে শুরু করেছে। এখন অর্থের সংস্থান হয়েছে, মন্ত্রিসভায় ৬০৪ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে এবং তা এডিবি হয়ে ইউনিসেফের কাছে যাবে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪১৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ কোটি টাকার চালান পাওয়া গেছে।
মন্ত্রী টেন্ডার আহ্বান না করে সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, টেন্ডারে সময় লাগে, দুর্নীতি হয়। সে জন্য সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে কর্মীসংকট থাকলেও মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানোর মতো সক্ষমতা রয়েছে। সরকার নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের দিকেও যাচ্ছে।



