হাঁটুর লিগামেন্ট ও মেনিসকাস ছেঁড়া: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি
হাঁটু মানবদেহের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জটিল এবং ভারবহনকারী জয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। খেলাধুলা, আকস্মিক দুর্ঘটনা, হঠাৎ মোচড় খাওয়া বা পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় হাঁটুর লিগামেন্ট ও মেনিসকাস ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ফুটবল, ক্রিকেট, দৌড়ঝাঁপের খেলা এবং মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এই ধরনের আঘাত বেশি দেখা যায়।
হাঁটুর গঠন ও আঘাতের ধরন
হাঁটুর জোড়ায় চারটি প্রধান লিগামেন্ট অবস্থান করে। লিগামেন্ট হলো এক ধরনের টিস্যু যা এক হাড়কে অন্য হাড়ের সাথে সংযুক্ত করে, জোড়ার শক্তি প্রদান করে এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। যেকোনো লিগামেন্টে আঘাত লাগতে পারে। অন্যদিকে, মেনিসকাস হলো হাঁটুর ভেতরের নরম কার্টিলেজ যা ঝাঁকুনি শোষণ করে এবং জোড়ার কার্যকারিতা রক্ষা করে।
আঘাতের লক্ষণসমূহ
হঠাৎ তীব্র ব্যথা, হাঁটু ফুলে যাওয়া, শব্দ করে মোচড় খাওয়া, হাঁটতে কষ্ট বা হাঁটু লক হয়ে যাওয়া, হাঁটুতে ভর দেওয়া যাচ্ছে না, হাঁটু বেঁকে যাওয়া—এসবই লিগামেন্ট বা মেনিসকাস ছেঁড়ার সাধারণ লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই ফোলা দেখা দেয়, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা পরেও ফোলা প্রকাশ পেতে পারে।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও সতর্কতা
আঘাতের পরপরই হাঁটুকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনোভাবেই হাঁটুতে চাপ দেওয়া উচিত নয়। হাঁটুতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট করে দিনে কয়েকবার বরফের সেঁক দিতে হবে। কম্প্রেশন বা চাপ দেওয়ার জন্য ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ ব্যবহার করা যেতে পারে। বালিশ বা কুশনের ওপর পা একটু উঁচুতে রাখলে ফোলা কমতে সাহায্য করে। নিজে নিজে মালিশ করা বা জোর করে হাঁটাচলা করা সম্পূর্ণ নিষেধ, কারণ এতে ক্ষতি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। দীর্ঘ সময় পা ঝুলিয়ে বসে থাকা এড়িয়ে চলতে হবে।
চিকিৎসা পদ্ধতি ও পুনর্বাসন
তীব্র ব্যথা, হাঁটু স্থির না থাকা, হাঁটতে না পারা বা দীর্ঘদিন ফোলা থাকলে অবশ্যই অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করবেন এবং প্রয়োজন হলে এমআরআই পরীক্ষার মাধ্যমে লিগামেন্ট বা মেনিসকাসের ক্ষতির মাত্রা নির্ণয় করবেন।
হাঁটুর লিগামেন্ট ও মেনিসকাস ছেঁড়ে গেলে চিকিৎসা আঘাতের মাত্রার উপর নির্ভর করে। হালকা ছেঁড়া হলে ওষুধ, বিশ্রাম, ব্রেস ব্যবহার এবং ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে সুস্থতা অর্জন সম্ভব। ফিজিওথেরাপি হাঁটুর শক্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সম্পূর্ণ লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে বা মেনিসকাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে আর্থ্রোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে ছোট ছিদ্র করে অস্ত্রোপচার করা হয়, যা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব করে তোলে। চিকিৎসার পর নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, খেলার আগে ওয়ার্মআপ এবং সঠিক জুতা ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়দের তাড়াহুড়ো করে মাঠে ফিরে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে।
হাঁটুর লিগামেন্ট বা মেনিসকাস ছেঁড়া ভয় পাওয়ার বিষয় নয়, তবে অবহেলা করলে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাই সময়মতো সঠিক চিকিৎসাই সুস্থতার মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়।
অধ্যাপক ডা. জি এম জাহাঙ্গীর হোসেন, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)


