প্রাপ্তবয়স্কদের হাম: শিশুদের চেয়ে বেশি ভয়াবহ ও জটিল
হাম সাধারণত শিশুদের রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও, বড় বয়সে এই রোগে আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি অনেক বেশি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। গবেষণা ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের হামে আক্রান্ত হওয়ার পর নিউমোনিয়া, লিভারের প্রদাহ বা হেপাটাইটিস এবং মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি থাকে। বিশেষ করে, ২০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে হাম–পরবর্তী মৃত্যুঝুঁকি বা দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যার হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে প্রমাণিত হয়েছে।
হামের লক্ষণগুলো চিনে রাখুন
হামের ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ১০ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। সাধারণত নিচের পর্যায়গুলোতে লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
- প্রাথমিক ধাপ: প্রচণ্ড জ্বর, ক্লান্তি, শুকনো কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া।
- কপলিক স্পটস: মাড়ির উল্টো দিকে গালের ভেতরের অংশে ছোট ছোট সাদাটে বা ধূসর দাগ দেখা দেওয়া, যা হামের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
- র্যাশ বা লালচে দানা: জ্বরের ৩-৪ দিন পর মুখে ও কানের পেছনে লালচে দানা দেখা দেয়, যা দ্রুত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগের তীব্রতা বাড়াতে পারে।
সংক্রমণের কারণ ও ঝুঁকির বিষয়গুলো
হাম সংক্রমণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ছোটবেলায় এমএমআর টিকা না নেওয়া বা অপূর্ণ রাখা, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম বা পুষ্টিহীনতার কারণে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া, যা সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।
- আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় বাতাসের মাধ্যমে সহজেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বড়দের ক্ষেত্রে হামের জটিলতাগুলো
প্রাপ্তবয়স্কদের হামের কারণে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনাইটিস হতে পারে, যার জন্য যান্ত্রিক ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া, শ্রবণশক্তি হারানো, অন্ধত্ব এবং ‘এসএসপিই’ নামক মস্তিষ্কের এক ভয়াবহ রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা কয়েক বছর পর প্রকাশ পেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধে করণীয়
হাম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- টিকাদান: যাঁরা আগে টিকা নেননি, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এমএমআর টিকা গ্রহণ করুন। এটিই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য উপায় হিসেবে স্বীকৃত।
- ভিটামিন এ গ্রহণ: হামের তীব্রতা কমাতে উচ্চ মাত্রার ভিটামিন এ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে, যা রোগের প্রভাব হ্রাস করতে সাহায্য করে।
- আলাদা রাখা: সংক্রমণ ছড়ানো রোধে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ৫-৭ দিন আলাদা ঘরে রাখা জরুরি, যাতে অন্যরা সংক্রমিত না হয়।
- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা: নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং হাঁচি-কাশির সময় রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করা সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক।
- বিশ্রাম ও পুষ্টি: এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং তরলজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে, বিশেষ করে ভিটামিন সি–জাতীয় খাবার, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সতর্কবার্তা ও বিশেষ নির্দেশনা
জ্বরের সঙ্গে শরীরে দানা দেখা দিলে বা চোখ লাল হয়ে গেলে অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে হাম গর্ভপাত বা সময়ের আগে সন্তান প্রসবের কারণ হতে পারে। তাই লক্ষণ দেখামাত্র কাছের হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে সচেতনতাই পারে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে আপনাকে রক্ষা করতে এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে আনতে।



