রাজশাহীতে হামের প্রকোপে শিশু মৃত্যু উদ্বেগজনক, আইসিইউ সংকটে চিকিৎসা ব্যবস্থা বিপর্যয়
রাজশাহীতে হামে শিশু মৃত্যু, আইসিইউ সংকটে চিকিৎসা বিপর্যয়

রাজশাহীতে হামের প্রকোপে শিশু মৃত্যু উদ্বেগজনক, আইসিইউ সংকটে চিকিৎসা ব্যবস্থা বিপর্যয়

রাজশাহী অঞ্চলে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হামের ব্যাপক বিস্তারে শিশুদের মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রাজশাহী বিভাগের সাতটি সদর হাসপাতাল এবং চারটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছে।

আইসিইউ সংকট ও শিশু মৃত্যুর করুণ চিত্র

হামে আক্রান্ত শিশুদের সুপারিশ করা হচ্ছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। কিন্তু আইসিইউতে শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) হাম আক্রান্ত চার শিশুকে নেওয়া হয়েছিল আইসিইউতে। তাদের মধ্যে বেঁচে আছে শুধু একজন। বাকি তিন শিশুই মারা গেছে। শনিবার (২৮ মার্চ) আরও তিন শিশুকে আইসিইউয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

চলতি মাসে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউয়ে নেওয়ার পরেও ৯ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এমন রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থায় রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তাদের সাধারণ রোগীদের সঙ্গেই রাখা হচ্ছে। রাজশাহীতে একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনও রোগীকে রামেক হাসপাতাল থেকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংক্রমণের ব্যাপকতা ও আক্রান্ত অঞ্চল

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হাম রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। আক্রান্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায় সংক্রমণ বেশি হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত রাজশাহীতে ৮৪ জন হামের রোগীকে আইসিইউয়ে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আইসিইউয়ে নেওয়ার পরও ৯ জন এবং আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাবনায় শুক্রবার (২৭ মার্চ) পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ২৬ শিশু ‘হাম ওয়ার্ডে’ চিকিৎসাধীন। তবে পাবনায় মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭০ শিশু।

চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘হামের উপসর্গ নিয়ে যে সব রোগী আমাদের এখানে আসে, তাদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’ কিন্তু শুক্রবার (২৭ মার্চ) সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে হামের উপসর্গ থাকা কোনও রোগী পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শংকর কুমার বলেন, ‘তাহলে এখন রোগী নাই।’

সবশেষ বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার আট মাস বয়সী জান্নাতুল মাওয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের সাত মাস বয়সী হুমায়রা, একই জেলার শ্রীরামপুর গ্রামের নয় মাস বয়সী ফারহানা এবং কুষ্টিয়া সদরের পাঁচ মাস বয়সী হিয়াকে আইসিইউতে নিতে বলা হয়। হাসপাতালের রেজিস্টারে সবার রোগ ‘হাম’ উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে হুমায়রা ও ফারহানা শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালেই মারা যায়। অন্য দুই শিশুকে এখনও সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, জান্নাতুল মাওয়াকে একটি বেডে রাখা হয়েছে, যেখানে পর্যায়ক্রমে অন্য শিশুদেরও এনে ক্যানোলা করা হচ্ছে। শিশুটির নানি ফরিদা বেগম জানান, আইসিইউতে তাদের সিরিয়াল ২৯ নম্বরে। শিশু হিয়ার বাবা রিফাত জানান, তার মেয়ের অবস্থাও সংকটাপন্ন, অথচ আইসিইউতে নেওয়ার জন্য তাদের সিরিয়াল ৩২ নম্বরে। রামেক হাসপাতালের শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১২টি। এই আইসিইউ সুবিধাও সরকারি নয়। হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত।

মৃত্যু সনদে হামের উল্লেখ না থাকা ও তথ্য গোপন

এদিকে, হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য রোগ উল্লেখ করা হলেও ‘হাম’ শব্দটি অনুপস্থিত। এতে রোগটির প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আড়াই মাস বয়সী জহির নামের এক শিশুর মৃত্যুসনদে ‘হাম’-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে। শিশুটির মা জেসমিন খাতুন জানান, তার সন্তানকেও আলাদা না রেখে সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মাথায় গত ১৮ মার্চ সকালে শিশুটি মারা যায়।

হাসপাতালের সক্ষমতা ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন

রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘ডব্লিউএইচও ইতোমধ্যে ১০টি নমুনায় হাম নিশ্চিত করেছে, বাকি নমুনাগুলোতেও একই লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে।’ হামের রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা না দেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, হাসপাতালে দুটি আইসোলেশন ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নেই। এ ছাড়া ২০০ শয্যার বিপরীতে ঈদের আগে ৭০০-এর বেশি রোগী ভর্তি থাকায় পরিস্থিতি সামলানো কঠিন।

একই চিত্র দেখা গেছে রাজশাহীর বেসরকারি বারিন্দ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও। হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেলাল উদ্দিন জানান, সম্প্রতি একদিনে তাদের হাসপাতালে ৭৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৬০ জনের মধ্যে হামের লক্ষণ ছিল। এর আগের দিন ভর্তি হওয়া ২৮ জনের মধ্যে ২০ জনের একই উপসর্গ পাওয়া যায়। তারা শিশুদের লক্ষণ দেখে হাম সন্দেহ করে চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং তাতে রোগীরা সুস্থও হচ্ছে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের বক্তব্য ও পদক্ষেপ

রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহী অঞ্চলে হাম রোগ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি জানা যায়। ১৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপরে আরও কিছু শিশুর নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এবং আরও নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’

তিনি জানান, রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলাতেই শিশুরা হাম রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও পাবনায় রোগী বাড়ছিল। এখন একটু কমছে। শনিবার সকালে তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পাবনা গিয়েছেন। এর আগে ২৩ মার্চ তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে গিয়েছিলেন। ওই সময় হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৪ জন শিশু হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিল। এই জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা আগে কম ছিল, এখন বাড়ছে।