রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ফেরা নাসিমার করুণ মৃত্যু: পদ্মায় বাসডুবি, অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনা
রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ফেরা নাসিমার করুণ মৃত্যু

রানা প্লাজা থেকে বেঁচে ফেরা নাসিমার করুণ মৃত্যু: পদ্মায় বাসডুবি, অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনা

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার আটরাই গ্রামের বাসিন্দা নাসিমা বেগম (৪০) এক করুণ পরিণতির শিকার হয়েছেন। ২০১৩ সালে ঢাকার সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় তিন দিন ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েও তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন। কিন্তু গত ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আরও মর্মান্তিক হলো, তাঁর লাশ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটিও কুষ্টিয়া শহরের কাছাকাছি একটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল। গত শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে পার্বতীপুরের আটরাই গ্রামে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

ঈদের সফরে পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যু

নাসিমা বেগম ঈদের ছুটিতে রাজবাড়ীতে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি নাজমিরা খাতুনের (৩১) বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। ঈদ শেষে ঢাকায় ফেরার পথে এই দুর্ঘটনায় নাসিমা, নাজমিরা ও নাজমিরার ছেলে আবদুর রহমানের (৪) মৃত্যু হয়। নাজমিরার ভাশুর লিটন শেখ ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘দুপুরের পরে ভাই, ভাতিজা, ভাইয়ের বউ ও ভাইয়ের খালাশাশুড়ি ঢাকার উদ্দেশে একসঙ্গে বাড়ি থেকে বের হন। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বাসডুবির খবর পাই। বাসটি ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল, ভাই তখন বাস থেকে নিচে নামেন। কিছু সময় পরে আবার বাসে ওঠেন। বাস পানিতে পড়ে গেলে সবাই তখন বাসের ভেতরে ছিলেন। ভাই ডুবন্ত বাস থেকে বের হয়ে আমাকে ফোন করেন। আমি দ্রুত সেখানে যাই, কিন্তু আর কাউকে জীবিত উদ্ধার করতে পারিনি। রাত প্রায় ১১টার দিকে তিনজনের লাশ উদ্ধার হয়। একটা পরিবারের তিনটা মানুষ চলে গেলেন।’ গত বৃহস্পতিবার মহেন্দ্রপুরে তাঁদের দাফন করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নাসিমার জীবন সংগ্রাম ও ট্র্যাজেডির পটভূমি

নাসিমার ছেলে নাছিরুল ইসলাম (২৪) জানান, তাঁর বয়স যখন দুই বছর, তখন তাঁর মা–বাবার বিচ্ছেদ হয়। আট বছর আগে নাসিমার দ্বিতীয় বিয়ে হয় আটরাই গ্রামের নুর ইসলামের সঙ্গে। প্রথমবার বিবাহবিচ্ছেদের পর নাসিমা ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ নেন। ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত হন তিনি। এর পর থেকে তিনি গ্রামের বাড়িতেই থাকতেন। সাত মাস আগে স্বামী নুর ইসলামের মৃত্যু হলে বোন সানোয়ারার সংসারে থিতু হন নাসিমা। তিনি কাজের সন্ধান করছিলেন। এর মধ্যেই যোগাযোগ হয় ঢাকায় পোশাক কারখানায় কর্মরত বোনের মেয়ে নাজমিরার সঙ্গে। কথা ছিল ঈদের ছুটি শেষে ভাগনির সঙ্গে কাজে যোগ দেবেন। সে জন্যই ১৩ মার্চ রাজবাড়ীতে তিনি ভাগনির বাড়ি যান এবং সেখানেই ঈদ উদ্‌যাপন করেন। ঈদ শেষে ভাগনির সঙ্গে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন, কিন্তু দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশাসনের সহায়তা ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া

পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘নাসিমার বাড়ি গিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে।’ এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে নাসিমার জীবন সংগ্রাম এবং একের পর এক দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে।

এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি পরিবারের করুণ পরিণতি নয়, বরং বাংলাদেশের দুর্ঘটনা প্রবণতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলোরও প্রতিফলন। নাসিমা বেগমের জীবন সংগ্রাম ও মৃত্যু আমাদের সমাজে নিরাপত্তা ও সহায়তা ব্যবস্থার গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।