ঘুমের অভাব পাকস্থলীর মারাত্মক ক্ষতি করে, নতুন গবেষণায় উদ্বেগ
এক বা দুই রাত ঠিকমতো ঘুম না হলে আমরা সাধারণত শুধু ক্লান্তি বা মনোযোগের অভাব অনুভব করি। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে: ঘুমের অভাব সরাসরি আমাদের পাকস্থলীর ক্ষতি করতে পারে। এই গবেষণা অনুসারে, ঘুম কম হলে মস্তিষ্ক থেকে পাকস্থলীতে একটি অস্বাভাবিক সংকেত প্রেরিত হয়, যা গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুপথ ভেগাস নার্ভের মাধ্যমে পৌঁছায়।
গবেষণার মূল ফলাফল
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সেল স্টেল সেল’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতি মস্তিষ্ক থেকে পাকস্থলীতে ভুল সংকেত পাঠায়। এর ফলে পাকস্থলীর স্টেম কোষগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই স্টেম কোষগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো পাকস্থলীর ভেতরের আবরণ বা লাইনিং ঠিক রাখে এবং ক্ষতি হলে নতুন কোষ তৈরি করে মেরামত করে।
গবেষকরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, দুই দিন ধরে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ইঁদুরগুলোর পাকস্থলীতে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের লক্ষণ দেখা দেয়। এতে পাকস্থলীর স্টেম কোষের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে যায়, যা পাকস্থলীর পুনর্গঠন বা মেরামত করার ক্ষমতা ব্যাহত করে।
সেরোটোনিনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘুমের অভাবে পাকস্থলীতে সেরোটোনিনের মাত্রা বেড়ে যায়। সেরোটোনিন সাধারণত হজমপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং পাকস্থলীর পেশির সংকোচন-প্রসারণ ঠিক রাখে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেরোটোনিনের মাত্রা বেশি থাকলে তা ডায়রিয়া, পাকস্থলীর প্রদাহ বা টিউমার তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, ঘুমের অভাবে শুধু সেরোটোনিন বেশি তৈরি হচ্ছিল তা নয়; বরং শরীর সেটিকে দ্রুত শোষণ করতেও পারছিল না। ফলে পাকস্থলীতে এই রাসায়নিকের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
ভেগাস নার্ভের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছেন, মস্তিষ্কের সংকেত কীভাবে পাকস্থলীতে পৌঁছায়? তাদের ধারণা ছিল, এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে ভেগাস নার্ভ। ভেগাস নার্ভ হলো এমন একটি স্নায়ু, যা মস্তিষ্ককে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, বিশেষ করে হৃদযন্ত্র, ফুসফুস ও পাকস্থলীর সঙ্গে যুক্ত রাখে।
এই ধারণা পরীক্ষা করতে গবেষকরা কিছু ইঁদুরের ভেগাস নার্ভ কেটে দেন। দেখা গেল, যেসব ইঁদুরের ভেগাস নার্ভ ছিল না, সেগুলোর ক্ষেত্রে ঘুমের অভাব হলেও পাকস্থলী সেরোটোনিনের মাত্রা স্বাভাবিক ছিল এবং স্টেম কোষের সংখ্যাও কমেনি। এর মানে ভেগাস নার্ভের মাধ্যমেই ঘুমের ঘাটতির সংকেত পাকস্থলী পৌঁছাচ্ছিল।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই সংকেত পাঠাতে ভেগাস নার্ভ থেকে অ্যাসিটাইলকোলিন নামে একটি রাসায়নিক বের হয়, যা পাকস্থলীর কোষকে বেশি সেরোটোনিন ছাড়তে উদ্দীপিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
গবেষণার সহলেখক, চীনের চায়না অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির আণবিক জীববিজ্ঞানী ঝেংকুয়ান ইউ বলেন, ‘এ গবেষণায় আমরা দেখেছি, ঘুমের ব্যাঘাত খুব দ্রুত এবং মারাত্মকভাবে পাকস্থলীকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’ এই গবেষণা স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে যারা নিয়মিত ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
