মৃত নারীর জরায়ুতে জন্ম নিল শিশু হিউগো, মা গ্রেস বেলের স্বপ্নপূরণ
প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে একটি সন্তান বেড়ে ওঠে মায়ের জরায়ুতে। কিন্তু যেসব নারীর জরায়ু নেই, তাঁদের জন্য মাতৃত্বের স্বপ্ন প্রায় অসম্ভব বলে ধরা হয়। ত্রিশোর্ধ্ব নারী গ্রেস বেলের জীবনেও এমনই এক চ্যালেঞ্জ ছিল। জন্মগতভাবেই তাঁর জরায়ু অনুপস্থিত ছিল, যা তিনি ১৬ বছর বয়সে জানতে পারেন। তবুও মা হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁকে থামাতে পারেনি।
মাতৃত্বের পথে দুটি বিকল্প
গ্রেস বেল ও তাঁর জীবনসঙ্গীর সামনে মা হওয়ার জন্য দুটি প্রধান উপায় ছিল। প্রথমটি হলো সারোগেসি, যেখানে অন্য নারীর জরায়ুতে ভ্রূণ স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয়টি ছিল জরায়ু প্রতিস্থাপন, যেখানে গ্রেসের শরীরে অন্য কোনো নারীর জরায়ু স্থানান্তরিত করা সম্ভব হলে, তিনি নিজেই সন্তান ধারণ করতে পারবেন। এই বিকল্পটি বেছে নেওয়ায় গ্রেসের নিজের শরীরের ভেতরেই সন্তান বেড়ে উঠবে, তাঁর রক্ত থেকে পুষ্টি পাবে এবং একটি ভ্রূণ থেকে শিশুতে পরিণত হবে।
তবে জরায়ু দান করা সহজ বিষয় নয়। তাই যখন হঠাৎ করেই মৃত এক নারীর জরায়ু প্রতিস্থাপনের সুযোগ এল, গ্রেস আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠলেন। এই অনন্য ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের একটি ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ট্রায়ালের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়েছে।
জটিল অস্ত্রোপচার ও সফল জন্ম
২০২৪ সালের জুন মাসে অক্সফোর্ডের দ্য চার্চিল হাসপাতালে ১০ ঘণ্টা ব্যাপী এক জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। এই সময়ে গ্রেসের শরীরে মৃত নারীর দান করা জরায়ু সফলভাবে প্রতিস্থাপিত হয়। কয়েক মাস পর, লন্ডনের লিস্টার ফার্টিলিটি ক্লিনিকে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) প্রক্রিয়া করা হয়। গ্রেসের নিজের ডিম্বাশয় থেকে নেওয়া ডিম্বাণু এবং তাঁর জীবনসঙ্গীর শুক্রাণু ব্যবহার করে তৈরি ভ্রূণটি তাঁর প্রতিস্থাপিত জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
গ্রেসের শরীরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে সন্তান। অবশেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে, পশ্চিম লন্ডনের কুইন চারলটস অ্যান্ড চেলসি হাসপাতালে শিশুটির জন্ম হয়। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় সাত পাউন্ড এবং নাম রাখা হয় হিউগো। জন্মের পর গ্রেস বেল বলেন, ‘আমার দাতা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর মতো যথেষ্ট ভাষা আমার জানা নেই।’
বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর অর্জন
যুক্তরাজ্যের এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এ পর্যন্ত মোট ১০ জন নারীর দেহে মৃত নারীর জরায়ু সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে গ্রেস বেলই প্রথম নারী, যাঁর প্রতিস্থাপিত জরায়ুতে বেড়ে ওঠা সন্তান পৃথিবীর বুকে জন্ম নিয়েছে। একজন ব্যক্তির অঙ্গ অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা নিজেই অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া, আর সেই অঙ্গের ভেতরে একটি সন্তানের বেড়ে ওঠা বিজ্ঞানের এক অসাধারণ বিস্ময়। শল্যচিকিৎসকেরা এই সাফল্যে অংশীদার হতে পেরে অত্যন্ত খুশি।
এটি যুক্তরাজ্যে প্রথম প্রতিস্থাপিত জরায়ুতে সন্তান ধারণের ঘটনা নয়। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে কুইন চারলটস অ্যান্ড চেলসি হাসপাতালেই এমি নামের একটি শিশুর জন্ম হয়, যার মাকে জরায়ু দান করেছিলেন তাঁর জীবিত বোন। তবে মৃত নারীর দান করা জরায়ুতে বেড়ে ওঠা হিউগোর জন্মের গল্পটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য। বিশ্বজুড়ে এ পর্যন্ত শতাধিক জরায়ু প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং প্রতিস্থাপিত জরায়ুতে জন্ম নেওয়া সুস্থ শিশুর সংখ্যা ৭০-এর বেশি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য বিবেচনা
গ্রেস বেল ও তাঁর জীবনসঙ্গী চাইলে ভবিষ্যতে আরেকটি সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করতে পারবেন। তবে এরপর গ্রেসের শরীর থেকে এই প্রতিস্থাপিত জরায়ু অপসারণ করা হবে। কারণ, প্রতিস্থাপিত অঙ্গটিকে সুরক্ষিত রাখতে গ্রহীতাকে শক্তিশালী ওষুধ সেবন করতে হয়। গ্রেসকে যাতে সারা জীবন এমন ওষুধ খেতে না হয়, সেজন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং অনেক নারীর জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
