রমজানে সুস্থ থাকতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা
রমজানে সুস্থ থাকতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ: রোগীদের জন্য নির্দেশনা

রমজানে সুস্থ দেহে ইবাদত: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ

রমজান মাসে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে শরীরের জৈবিক ঘড়িতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। এই সময়ে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের, বিশেষ করে ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির রোগীদের শারীরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এই পরিবর্তনগুলো সামলানোর জন্য বাড়তি সচেতনতা ও প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। তাই রমজান মাস শুরুর আগে থেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে ওষুধের ডোজ ও জীবনযাত্রা সমন্বয় করা প্রয়োজন। অধ্যাপক ডা. মো. টিটু মিয়া, একজন মেডিসিন ও রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক অধ্যক্ষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন যা রোগীদের নিরাপদে রোজা রাখতে সহায়তা করবে।

ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা

ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য রমজানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে সুগার হঠাৎ কমে যাওয়া। ওষুধের ক্ষেত্রে, যাঁরা মেটফরমিন খান, তাঁদের ডোজ সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে। তবে সালফোনাইলইউরিয়া–জাতীয় ওষুধের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। গ্লাইবেনক্লামাইড এড়িয়ে গিয়ে আধুনিক ওষুধ, যেমন গ্লিক্লাজাইড বা ডিপিপি-৪ ইনহিবিটর ব্যবহার করা নিরাপদ। ইনসুলিন গ্রহণকারীদের সাহ্‌রির ডোজ বিভিন্ন হারে কমাতে হতে পারে। দিনের বেলায় সুগার চেক করলে রোজা নষ্ট হয় না, তাই নিয়মিত গ্লুকোমিটার দিয়ে সুগার পরীক্ষা করুন। যদি সুগার ৩.৯ এমএমওএল/এলের নিচে নামে, তবে সঙ্গে সঙ্গে শর্করাজাতীয় খাবার খেতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগ

রমজানে লবণের আধিক্য ও অনিদ্রার কারণে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধগুলো ইফতার বা সাহ্‌রিতে নির্দিষ্ট সময়ে সেবন করতে হবে। হার্ট ফেইলিউর বা হৃদ্‌রোগীদের ক্ষেত্রে পানি পানের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট করতে হবে। ইফতারে অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও প্রসেসড খাবার, যেমন চিপস, সস, আচার, এড়িয়ে চলা অত্যাবশ্যক।

কিডনির রোগ

কিডনির রোগীদের জন্য রোজা রাখা একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য। পানি কম পান করায় রক্তে ক্রিয়েটিনিন বা পটাশিয়াম বেড়ে যেতে পারে। সতর্কতা হিসেবে, যাঁদের কিডনির রোগের স্টেজ ৩ বা তার বেশি, তাঁদের রোজা রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি থাকে। গাউটের ক্ষেত্রে, রমজানে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। ইফতারে প্রচুর ডাল বা ছোলা খাওয়ার পরিবর্তে সবজি ও মাছের ওপর গুরুত্ব দিন। ব্যথার ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হলে অবশ্যই তা ইফতারের পর ভরা পেটে এবং গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের সঙ্গে খেতে হবে।

পরিপাকতন্ত্র ও পানিবাহিত রোগ

রমজানে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। বাইরের খোলা খাবার, অপরিষ্কার বরফ বা বারবার গরম করা খাবারের মাধ্যমে হেপাটাইটিস এবং টাইফয়েড ছড়াতে পারে। ইফতারে ভারী খাবার একবারে না খেয়ে ধাপে ধাপে খান। রাস্তার শরবত বা কৃত্রিম রংমিশ্রিত খাবার সম্পূর্ণ বর্জন করুন। যদি পাতলা পায়খানা শুরু হয়, তবে দ্রুত ওআরএস পান করে শরীরে পানির ভারসাম্য রক্ষা করুন।

ব্যায়াম ও জীবনযাপন

রোজা অবস্থায় ভারী ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা উচিত। ইফতারের ১-২ ঘণ্টা পর হালকা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তারাবিহর নামাজ পড়া হাঁটুর ব্যথার রোগীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে; তাঁরা প্রয়োজনে চেয়ারে বসে নামাজ পড়তে পারেন। তবে মনে রাখবেন, তারাবিহর নামাজও একধরনের শারীরিক ব্যায়াম, যা আপনার মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে।

কখন রোজা ভাঙবেন: জরুরি সতর্কতা

নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে রোজা ভাঙা উচিত:

  • অত্যধিক দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
  • প্রস্রাব একদম কমে যাওয়া বা রং গাঢ় হয়ে যাওয়া।
  • বুক ধড়ফড় করা বা প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট।
  • রক্তে শর্করা ৩.৯ এমএমওএল/এলের কম বা ১৬.৭ এমএমওএল/এলের বেশি হওয়া।

রমজান ইবাদতের মাস। সুস্থ থেকে সঠিকভাবে রোজা পালন করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তাই সচেতন থাকুন, সঠিক নিয়ম মেনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং নিরাপদ রমজান অতিবাহিত করুন।