ডাক্তারি পড়ার চাপে বাবাকে খুন করে ড্রামে ভরল ছেলে, লখনউতে নৃশংস ঘটনা
ভারতের উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউয়ের অভিজাত আসিয়ানা এলাকায় ডাক্তারি পড়ার চাপকে কেন্দ্র করে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ২১ বছর বয়সি এক যুবক তার নিজের বাবাকে গুলি করে হত্যা করার পর দেহটি খণ্ডবিখণ্ড করে একটি নীল প্লাস্টিকের ড্রামে ভরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) পুলিশ অভিযুক্ত অক্ষত সিংকে গ্রেফতার করার পর এই লোমহর্ষক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ্যে এসেছে।
বাবা-ছেলের তীব্র দ্বন্দ্ব ও হত্যাকাণ্ড
নিহত ব্যক্তি মানবেন্দ্র সিং (৪৯) পেশায় একজন মদ ব্যবসায়ী এবং একটি প্যাথলজি ল্যাবের মালিক ছিলেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ভোরবেলা পড়াশোনা নিয়ে বাবা ও ছেলের মধ্যে তীব্র ঝগড়া বাধে। মানবেন্দ্র সিং চেয়েছিলেন তার ছেলে অক্ষত সিং বিকম কোর্স ছেড়ে দিয়ে নিট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ডাক্তারি পেশায় আসুক। কিন্তু অক্ষত এই চাপে রাজি ছিলেন না এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
তর্কের এক পর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে অক্ষত তার বাবার লাইসেন্সকৃত রাইফেলটি নিয়ে তাকে গুলি করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটে অক্ষতের একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট বোনের চোখের সামনেই। ঘটনার পর তাকে কাউকে কিছু বললে তাকেও মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যা ঘটনাটির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে ড্রামে লুকানো
হত্যাকাণ্ডের পর অক্ষত প্রমাণ লোপাট করার জন্য এক ভয়ানক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তিনি বাড়ির তিন তলা থেকে বাবার দেহটি টেনে নিচে নামিয়ে আনেন এবং ঘরোয়া যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দেহটি কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত করেন। এরপর দেহের হাত ও পাগুলো গাড়িতে করে শহরের উপকণ্ঠে একটি নির্জন এলাকায় ফেলে দিয়ে আসেন। অন্যদিকে, ধড় ও মাথাটি একটি নীল রঙের প্লাস্টিক ড্রামে ভরে বাড়ির নিচতলার একটি ঘরে সযত্নে লুকিয়ে রাখেন।
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অক্ষত এই নৃশংস চক্রান্তটি সাজাতে এক বছর আগে মিরাটে ঘটে যাওয়া একটি আলোচিত ড্রাম-মার্ডার কেস থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্রেফতার ও স্বীকারোক্তি
মানবেন্দ্র সিং নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে একটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়েছিল। তবে পুলিশের জেরার সময় অক্ষতের বক্তব্যে অসংগতি ও গড়মিল দেখা দিলে তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সেই নীল ড্রামটি উদ্ধার করে এবং অক্ষতকে গ্রেফতার করে।
প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত যুবক আত্মহত্যার একটি মিথ্যা গল্প সাজালেও কড়া জেরার মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন যে তিনি প্রায় এক বছর ধরে এই খুনের পরিকল্পনা করছিলেন। তার এই স্বীকারোক্তি ঘটনাটির পূর্বপরিকল্পিত চরিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে।
পারিবারিক পটভূমি ও সমাজে প্রতিক্রিয়া
নিহত মানবেন্দ্র সিংয়ের স্ত্রী প্রায় নয় বছর আগে মারা যান এবং তার বাবা ছিলেন উত্তরপ্রদেশ পুলিশের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এই পারিবারিক পটভূমি ঘটনাটিকে আরও জটিল ও মর্মান্তিক করে তুলেছে। লখনউ শহরজুড়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
এই ঘটনা শিক্ষার চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জটিল বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডাক্তারি পড়ার মতো পেশাগত চাপ যুবকদের উপর কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, এটি তার একটি করুণ দৃষ্টান্ত। পুলিশ এখন বিস্তারিত তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
