প্রাইভেটকারের দাবি পূরণ না হওয়ায় যুবকের আত্মহত্যার চেষ্টা, বাঁচাতে গিয়ে দগ্ধ পুরো পরিবার
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় এক মর্মান্তিক ঘটনায় একটি পরিবারের চার সদস্য গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন। প্রাইভেটকার কিনে না দেওয়ায় অভিমানে এক যুবক নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিলে তাকে বাঁচাতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যরাও দগ্ধ হন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার মিতরা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের বরাতে জানা গেছে, জনি নামের ২৫ বছর বয়সী যুবক দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। তিনি পরিবারের কাছে একটি প্রাইভেটকার কিনে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন, যার যুক্তি ছিল গাড়িটি ভাড়ায় চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা।
পরিবার যখন তার এই দাবি পূরণে রাজি হয়নি, তখন মুহূর্তের অভিমান ও ক্ষোভে জনি ঘরের ভেতর নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
পরিবারের বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা ও বিপর্যয়
জনির চিৎকার শুনে তার মা মাফিয়ারা বেগম (৫৫), বাবা শামছুল বিশ্বাস এবং বড় ভাই মাসুম বিশ্বাস (৩৫) ছুটে যান ঘটনাস্থলে। আগুনের ভয়াবহতা উপেক্ষা করে তারা ঘরে ঢুকে জনিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টাই বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আগুনে চারজনই গুরুতরভাবে দগ্ধ হন, যা পুরো পরিবারের স্বপ্নকে ছারখার করে দেয়।
স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাদের অবস্থার অবনতি দেখা দিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।
স্থানীয় ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
বেতিলা মিতরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইকবাল হোসেন ঘটনা সম্পর্কে বলেন, "জনি এলাকায় নেশাগ্রস্ত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রাইভেটকার কেনার টাকা না পেয়ে তিনি এমন চরম সিদ্ধান্ত নেন। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে পরিবারের সবাই দগ্ধ হয়েছেন, যা সত্যিই মর্মান্তিক।"
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. হারুনুর রশিদ জানান, দগ্ধ চারজনকে ভর্তি করা হয়েছে এবং তাদের শরীরের কত শতাংশ পুড়েছে তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গুরুতর দগ্ধ রোগীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন, যা হাসপাতালে প্রদান করা হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ওসি ইকরাম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, "প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, প্রাইভেটকার কিনে না দেওয়ায় জনি নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
সমাজের জন্য শিক্ষণীয় দিক
এই ঘটনা সমাজের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে:
- মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপের অভাব
- যুবকদের মধ্যে হতাশা ও চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা
- পরিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা
- মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্যতা ও গুরুত্ব
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডিই নয়, বরং সমগ্র সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা বহন করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুবকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা ও মাদকাসক্তির সমস্যা মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
