হাওরে বিষধর সাপের ছোবল: ওঝার মন্ত্রে বোরহানের জীবন-মরণ লড়াই
শত শত বছর ধরে হাওরের ঢোলকলমি ও হিজল-করচ গাছের ছায়ায় লুকিয়ে থাকে আলদ সাপ। কুচকুচে কালো, তেল-চকচকে দেহের এই বিষধর প্রাণীটি তার বদমেজাজি স্বভাবের জন্য কুখ্যাত। মাথা চিকন হলেও এটি সহজেই টাকি বা নলা মাছ গিলে ফেলতে পারে। শিকারের সময় মানুষ বা গরুর সামনে পড়লে রক্ষা নেই। লকলকে দেহ স্প্রিংয়ের মতো লেজের ওপর ভর করে দাঁড়ায়, ফোঁসফোঁস শব্দে দ্রুতগতিতে তাড়া করে। কিন্তু আজ এক অদ্ভুত ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন সাপটি। একজন মানুষকে ফেলে এসেছে, অনেক দিনের মজুত বিষ উগলে দিয়ে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। তার চারপাশে রাজা ফড়িং পাক খাচ্ছে, পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুধসাদা বক।
বোরহানের দুর্ভাগ্য ও ছোবলের মুহূর্ত
সকালবেলা গফাইখালীর ডহরে ঘাস কাটতে এসেছিল কেশবপুরের তরুণ বোরহান। একটি টাকি মাছ তাড়া করতে গিয়ে হঠাৎ তার সামনে পড়ে যায় কালো আলদ সাপ। বিজলির চমকের মতো দেহ শূন্যে দুলে ওঠে। বিস্ফারিত চোখে বোরহান হেলে পড়ার মুহূর্তেই ছোবলটা লাগে তার বুকে। বোরহানের বাবা নেই, তাই মা-বোনের দিশাহারা চিৎকারে আশপাশের বাড়ি থেকে লোকজন ডিঙি বেয়ে ছুটে আসে। ঝড়ো বাতাসে হাওর উথালপাতাল, কালো থমথমে আকাশ মাথার ওপর নেমে আসে। শনশন গর্জন তুলছে রাগী বাতাস, ডিঙিগুলো ঢেউয়ে অনিশ্চিত ভঙ্গিতে দুলছে। প্রকৃতি মারমুখো, যেন রুষ্ট বিধাতার কঠিন মুখ।
কালো চামড়ায় কলমিপাতার বাহার থাকা তরুণ বোরহানের ঠোঁটে বিষের প্রতিক্রিয়ায় ফেনা, মুখ পোড়া কয়লার মতো। অজ্ঞান দেহটা চেয়ারে হেলে পড়ে আছে। বোরহান গভীর ঘুমে অচেতন, না মরে গেছে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা। স্মার্টফোন হাতে ঘুরে বেড়ালেও হাওরবাসীর বিশ্বাস-অবিশ্বাস উনিশ শতকেই থমকে আছে। তাই সাপেকাটা রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না নিয়ে ডাকা হয়েছে আফিল ওঝাকে। মাছ ধরা ও বিক্রি করা এই লোকটির পেশা হলেও সাপেকাটা রোগীর দেহ থেকে বিষ নামানো তার নেশা।
ওঝার মন্ত্র ও হাওরবাসীর বিশ্বাস
আফিল ওঝা নেচে নেচে গাইছে: “হেই...ই ধর্ম ছালি, পাঁচ ভাই পাণ্ডব ছালি, আসমান ছালি, জমিন ছালি, পৃথিবী ছালি, ব্রহ্মা—ছালি। যেইখানে বিষ্যের ঘর, সেইখানে উড়াল দিয়া পড়।” ওঝার মন্ত্রপড়া হাত রোগীর মস্তকে পড়ে। উপস্থিত কেউ কেউ ফিসফিস করে বলে: আলদ সাপে ছোবল মারলে দশ মিনিটেই শেষ। থুত্থুরে এক বুড়ো বলেন, “বেজাত সাপে কামুড় মারলে আত্মা ছাপুরিয়া থাহে। বেউল্লা সুন্দরীর পতি লখিন্দরের কথা মনে নাই?”
বিদ্যুতের চকচকে আলো, ঝকঝকে পাকা রাস্তা, মোবাইল-ইন্টারনেট—হাওরের খেয়ালি প্রকৃতির মধ্যে এই আধুনিক প্রযুক্তি কখনো কখনো প্রায় অর্থহীন। অতিবৃষ্টি বা ঢলে যেমন ধান তলিয়ে যায়, তেমনি এখানে কেউ কেউ ছোবল খায় বিষধর সাপের। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপেকাটা রোগীর জন্য ‘ভেনাম’ রাখা থাকলেও হাওরবাসীদের অনেকেই ভরসা রাখে ওঝাতে। এই ডিজিটাল জমানাতেও হাওরের দেশে সাপের যেমন অন্ত নেই, তেমনি ওঝাও আছে।
প্রকৃতির রূপ ও হাওরের ইতিহাস
আকাশজুড়ে শ্রাবণের ঘনকালো মেঘ, মাঝে মাঝে টুটফাটা মেঘের ফাঁক দিয়ে ঝলক ঝলক আলো আছড়ে পড়ে। হাওরময় সংসার ঝলমল করে ওঠে, তো একটু পরেই আবার গোমড়া। থমথম করে বগার হাওর, গলাকাটা হাওর, খেওলার হাওর। দক্ষিণে ভবানীগঞ্জ বাজারের পরে গঙ্গাচরার হাওর। যেদিকেই চোখ যায় শুধু হাওর আর হাওর। হু হু, শোঁ শোঁ বাতাসে পানি কলকল করে, খলখল করে ঢেউ। থমথমে কালো আকাশের নিচে অথৈ-উন্মত্ত সাগর আর কুয়াশাময় ঝাপসা অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা গ্রামগুলোর দিকে তাকালে মন কেমন করে ওঠে।
পানির গন্ধভরা বাতাস মুঠো মুঠো ঠান্ডা পরশ নিয়ে আসে। বাড়ির পেছনে টাউক, টাউক শব্দে ডাহুক পাখির ডাক। হাওরে পাখির কি অন্ত আছে? কানিবক, ধলাবক—বকপাখিই চার প্রকার। সব বিচিত্র সুর আর ঢেউয়ের গান মিলে ভাটির দেশে প্রকৃতিই সেরা গায়ক। পানির দেশের সুর-তাল-লয়ের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আফিল গায় বেহুলা-লখিন্দরের গান, রোগীর চারপাশে ঘুরে মন্ত্র পড়তে থাকে।
আফিল ওঝার সংগ্রাম ও হাওরের সমাপ্তি
কালো চকচকে শরীর, মাথায় কালো বাবরি আর কালো পুরুষ্ট ঠোঁটের ওপর হালকা গোঁফ নিয়ে আফিল ওঝা যেন রূপকথার হাবশি তরুণ। হাওরের দেশে ফরসা মানুষ বিরল, ভাগ্যবানরা অন্যের শ্রম চুরি করে বছরের তপস্যায় একটু-আধটু ফরসা হয়। হাবশি-কালো আফিলের নৃত্যের তাল, হাত-পায়ের কাজ, বিচিত্র ভঙ্গিতে বাবরিটার নাচন—মন্ত্রের সুরের সঙ্গে তরুণ ওঝার সবকিছুই দর্শকরা গিলছে। কাঁদছে শুধু বোরহানের মা-বোন।
রোগীর দেহ থেকে বিষ নামানোর জন্য আফিল উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে বেহুলার দুর্দশার কথা বয়ান করে। মেঘ কেটে গেলে পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্যের লাল আলোয় ঝলমল করে গলাকাটা হাওরের পানি। খেয়ালি প্রকৃতি একটুখানি হাসে। হাওরের পাগলা বাতাস বাড়িতে ঢুকে মাতালের মতো পাক খায়, আফিলের দেহের ঘাম শুকায় আবার ভেজে। হাওরের ঝড়ো বাতাস আর ঢেউয়ের গর্জন ছাপিয়ে শোনা যায় তার গলা: “মাছের মিলন খালে-বিলে, পাখির মিলন ডালে, আমার মিলন হলো ভঙ্গ, কাল-বাসর ঘরে।”
হঠাৎ আকাশ আবার অন্ধকার হয়ে যায়। সাপে ছোবল মারার মতো ফোঁস করে বিজলি চমকায়, ঝলসে ওঠে হাওরের দেশ। বজ্রপাতের গড়র...গড় শব্দ আকাশেই বিস্ফোরিত হয়। ঝনঝন করে কেঁপে ওঠে টিনের চাল, দর্শকরা দুই হাতে কান চেপে বারান্দায় দৌড়ে ওঠে। সকাল থেকে মন্ত্রের পর মন্ত্র, আফিলের বিরক্তিও চরমে। কিছুতেই বিষ নড়ছে না। সে নাচের তালে দুলতে দুলতে রাগে খাচ্চি ভাষার মন্ত্র বলতে শুরু করে।
সূর্যের মুখ দেখা না গেলেও হাওরের পতঙ্গ-পাখি-পিঁপড়ার মতো আফিলও অনুভব করে দুপুর গড়িয়ে গেছে। মাঝে একবার হাওয়া পড়ে গিয়েছিল, এখন আবার শুরু হয়েছে ঝড়ো বাতাসের উথালপাতাল। দেহমন শীতল করা বাতাসে পানি, কচু-কলমির ভেষজ গন্ধ...প্রকৃতির এই সতেজ বাতাসে বোরহান হয়তো বেঁচে উঠবে, নাম-যশ হবে আফিলের। অথবা মারা যাবে। বোরহানের মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য উপস্থিত বুড়োদের কেউ কেউ হয়তো বলবেন: “সাপে খায় লেখাত, বাঘে খায় দেখাত।”
