একটি ছবি আপলোড করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু তার পরিণতি থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন পুরো জীবন। ইমেজ-ভিত্তিক যৌন নির্যাতন, যা অমতে অন্তরঙ্গ ছবি শেয়ার করার নামে পরিচিত, বর্তমানে অনলাইন শোষণের দ্রুত বর্ধনশীল রূপগুলোর একটি।
কতজন শিকার হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৫% মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই এই নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অমতে স্পষ্ট ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা, এবং জোরপূর্বক বা প্রতিশোধ হিসেবে প্রকাশের হুমকি দেওয়া।
ইন্টারনেট যোগাযোগ সহজ করলেও ব্যক্তিগত লঙ্ঘনকে ভয়াবহভাবে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরিচিত নয়, বরং ভুক্তভোগীরই বিশ্বস্ত কেউ, যেমন বর্তমান বা সাবেক সঙ্গী, এই অপরাধের মূলহোতা।
সংগঠিত গোষ্ঠীর ভূমিকা
কিছু অনলাইন গ্রুপ মেসেজিং অ্যাপ ও ব্যক্তিগত চ্যানেল ব্যবহার করে অমতে অন্তরঙ্গ ছবি কেনাবেচা ও প্রচার করে। দক্ষিণ কোরিয়ার কুখ্যাত ‘এনথ রুম’ কেলেঙ্কারি এবং বাংলাদেশে অনলাইন শিকারিদের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রমাণ করে ডিজিটাল যুগে এই অপব্যবহার কত সহজে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে নির্যাতন শুধু ছবি ফাঁস দিয়েই শেষ হয় না। ভুক্তভোগীকে প্রায়শই অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়। অপরাধী কেন অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করল তা না ভেবে সমাজ জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি প্রথমে ছবি কেন পাঠিয়েছিলে?’
দোষারোপের সংস্কৃতি
ছবিগুলো সম্পর্কের মধ্যে সম্মতিতে শেয়ার করা হোক, হ্যাকিং বা প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া হোক, দায়ভার প্রায়ই অপরাধী থেকে ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো হয়। লজ্জা, ধমক ও সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে অনেক বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি অপরাধ রিপোর্ট করা বা সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত থাকেন।
এম নামের ১৯ বছর বয়সী এক মেয়ে নিজেই এর শিকার। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার সাবেক সঙ্গী তার অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও ফাঁস করে। ছবিগুলো অনলাইন ড্রাইভের মাধ্যমে বিক্রি হয় এবং এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে অন্য স্কুলের অপরিচিতরা তাকে যৌন আপত্তিকর বার্তা দিয়ে উত্ত্যক্ত করতে থাকে। ধমক এতটাই বাড়ে যে সে ভেঙে পড়ে।
পরিবারের ভেতরেও নির্যাতন
ইমেজ-ভিত্তিক যৌন নির্যাতন পরিবার ও বিবাহের ভেতরেও ঘটে। ফরাসি নারী জিজেল পেলিকোর ঘটনা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল, যেখানে তার স্বামী তাকে বছরের পর বছর ড্রাগ দিয়ে অচেতন করে অপরিচিতদের ধর্ষণের আমন্ত্রণ জানায় এবং গোপনে ভিডিও ধারণ করে।
গবেষণা দেখায়, এই নির্যাতনের পরিণতি ডিজিটাল জগতের বাইরেও বিস্তৃত। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা প্রায়ই উদ্বেগ, বিষণ্নতা, লজ্জা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগেন; অনেকেই আত্মহত্যার চিন্তা করেন। অন্তরঙ্গ ছবির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বিশ্বাসের বোধ হারানো।
প্রয়োজন আইন ও সমাজের পরিবর্তন
ইমেজ-ভিত্তিক যৌন নির্যাতন কেবল গোপনীয়তা লঙ্ঘন নয়; এটি বিশ্বাস, স্বায়ত্তশাসন ও মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন। প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে আইন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সমাজেরও পরিবর্তন প্রয়োজন। অপরাধীদের জবাবদিহি করতে হবে, ভুক্তভোগীকে দোষ না দিয়ে সমর্থন দিতে হবে এবং ডিজিটাল স্থান সবার জন্য নিরাপদ করতে হবে। প্রশ্নটি কখনই হওয়া উচিত নয়, ‘তুমি ছবি কেন পাঠিয়েছিলে?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘কেন কেউ অন্যের বিশ্বাস লঙ্ঘন করতে বেছে নিল?’



