১৪ মাস পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত

২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের যুদ্ধের পর ১৪ মাস কেটে গেছে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশীর এই সংক্ষিপ্ত ও বিপজ্জনক সংঘাত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চরম উত্তেজনা তৈরি করে রেখেছিল। তবে ইতিহাসের কিছু নজির, বর্তমান ভূ-অর্থনীতি এবং নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে সচেতনতা—এসব কিছু ইঙ্গিত করছে যে সম্পর্ক হয়তো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে। অন্তত পরবর্তী কোনো সংকট আসার আগপর্যন্ত।

২০২৫ সালের যুদ্ধ: একটি সংক্ষিপ্ত ও তীব্র সংঘাত

২০২৫ সালের মে মাসের এই যুদ্ধ ১৯৭১ সালের পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে গুরুতর সংঘাত। এর আগে ১৯৯৯ সালে বিতর্কিত কাশ্মীরের কারগিল পাহাড়ে প্রায় তিন মাস ধরে বড় ধরনের মুখোমুখি সংঘাত হয়েছিল। তবে সেই লড়াই ছিল নির্দিষ্ট একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ। এবারের চার দিনের যুদ্ধটি সংক্ষিপ্ত হলেও ছিল অত্যন্ত তীব্র। এর বিস্তৃতি ছিল বিশাল এলাকাজুড়ে। দুই দেশই একে অপরের ভূখণ্ডের গভীরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। উভয় পক্ষই বিভিন্ন দেশ থেকে আনা সামরিক সরঞ্জাম ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। পাকিস্তান চীন ও তুরস্কের তৈরি অস্ত্র ব্যবহার করেছে, আর ভারত নির্ভর করেছে ফ্রান্স ও ইসরায়েলের অস্ত্রের ওপর।

এই যুদ্ধের আগের চার বছর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল—যদিও যোগাযোগ না থাকায় তা ছিল নামমাত্র। কিন্তু ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগাম শহরে সন্ত্রাসীদের হামলায় ২৬ জন ভারতীয় পর্যটক নিহত হন। এরপরই ভারতের জনগণ, গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রতিশোধের তীব্র দাবি ওঠে। নয়াদিল্লি এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং একে সন্ত্রাসবাদবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে পাকিস্তানের ভেতরে বিমান হামলা চালায়। তবে ইসলামাবাদ এই হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে, যদিও ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তাদের। ভারত এখানেই থেমে থাকেনি, তারা পাকিস্তানের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, বাণিজ্য স্থগিত করে এবং প্রথমবারের মতো ‘সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি’ স্থগিত করে। অথচ এই চুক্তিটি ছিল দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের এক অনন্য ও স্থায়ী সহযোগিতার প্রতীক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক পরিস্থিতি

২০২৫ সালের যুদ্ধের পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি সম্পর্ককে আরও দূরে ঠেলে দিয়েছে। পাকিস্তান তাদের দেশে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) মতো গোষ্ঠীগুলোর হামলা বৃদ্ধির জন্য ভারতকে দায়ী করছে; ভারত অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে ভারতের বাড়তে থাকা সম্পর্ক ইসলামাবাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, তালেবান টিটিপি-কে আশ্রয় দিচ্ছে এবং ভারত তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে ভারতের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান সামরিক চুক্তি নয়াদিল্লিকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের যুদ্ধে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো ভারতের বিরুদ্ধে চীনা অস্ত্র ব্যবহার করেছিল।

এসব দেখে মনে হতেই পারে যে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরেকটি সংকটের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে পরিস্থিতি যতটা জটিল মনে হচ্ছে, সম্পর্ক জোড়া লাগার সম্ভাবনা হয়তো ততটা অসম্ভব নয়।

ইতিহাসের নজির: সংঘাতের পর উত্তেজনা কমেছে

ইতিহাস আমাদের আশ্বস্ত করে। অতীতেও সংঘাতের পর দুই দেশের উত্তেজনা কমেছে এবং বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ফিরে এসেছে। ১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশভাগ এবং এর কয়েক মাস পর প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরও দুই দেশ বাণিজ্য বাড়িয়েছিল এবং নতুন চুক্তি করেছিল। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর—যেখানে ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের পূর্ব অংশ বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে—১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ সীমিত আকারে বাণিজ্য শুরু করে।

২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাইয়ে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৬৬ জন নিহত হওয়ার মাত্র এক বছর পর, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ভারতের ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ এবং পাকিস্তানের ‘জং গ্রুপ’ সাংস্কৃতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে একটি শান্তি উদ্যোগ চালু করে। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি গ্রহণের পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতি কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালের শুরুতে মোদির পাকিস্তান সফরের মাত্র এক সপ্তাহ পর একটি ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার জেরে এই অবস্থান আরও কঠিন হয়।

তা সত্ত্বেও, ২০১৯ সালে ভারতের কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং এর জের ধরে তৈরি হওয়া তীব্র উত্তেজনার পর, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ সীমান্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হয়। এটি ছিল সংযমের একটি বড় উদাহরণ।

নতুন সংঘাত এড়ানোর কারণ

আজ দুই পক্ষের কাছেই নতুন সংঘাত এড়ানোর জোরালো কারণ রয়েছে। পাকিস্তান বর্তমানে আফগান সীমান্তে তালেবান এবং ইরান সীমান্তে সীমিত দ্বিপক্ষীয় বিরোধ সামলাতে ব্যস্ত। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও ভারতের জন্য বেইজিং এখনো বড় সীমান্ত চ্যালেঞ্জ।

সামগ্রিকভাবে, ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশই এক অশান্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব দুই দেশের ওপরই পড়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে লাখ লাখ ভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রবাসী কাজ করেন এবং এই অঞ্চল থেকেই দুই দেশের প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাসের বড় অংশ আসে। চারদিকে এত সংকট থাকায়, ভারত বা পাকিস্তান কেউই নতুন কোনো যুদ্ধ জড়াতে চায় না।

এই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণেই হয়তো ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির মূল সংগঠন আরএসএস-এর জ্যেষ্ঠ নেতা দত্তাত্রেয় হোসাবালে সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দেশের নিরাপত্তা ও আত্মসম্মান রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। তবে এর অর্থ এই নয় যে আলোচনার দরজা বন্ধ করে দিতে হবে। আমাদের সব সময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত।’

একইভাবে, গত কয়েক মাসে দুই দেশের সাবেক কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে, যার মধ্যে চলতি সপ্তাহেই শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডে আলোচনা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দেয় যে উভয় পক্ষই নতুন সংঘাতের চড়া মূল্য বুঝতে পারছে এবং বাস্তববাদী হতে চাইছে। এর একটি বড় প্রমাণ মেলে গত নভেম্বরে, যখন দিল্লির লাল কেল্লার কাছে একটি গাড়িবোমার বিস্ফোরণ ঘটে। ভারত এর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেনি এবং কোনো পাল্টা হামলাও চালায়নি।

যুদ্ধের রাজনৈতিক ফায়দা

তবে এর মানে এই নয় যে নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি নেই। সামরিক কৌশলগত দিক থেকে দুই দেশই ২০২৫ সালের যুদ্ধ থেকে ভুল শিক্ষা নিয়েছে এবং উভয় পক্ষই এর রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছে। যুদ্ধের আগে পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে জনগণের ক্ষোভের মুখে ছিল। কিন্তু যুদ্ধে ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি এবং দেশপ্রেমের কার্ড খেলে তারা জনগণের সমর্থন ফিরে পায়। অন্যদিকে, ভারতের সরকারও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে, যা গত জাতীয় নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না পাওয়ার এক বছর পর তাদের জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করেছে।

উভয় দেশই এখন মনে করছে যে পারমাণবিক সীমার নিচে থেকেই তারা সীমিত আকারে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। ২০১৬, ২০১৯ এবং ২০২৫—এই তিনবারের সংঘাতের তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। দিল্লি ও ইসলামাবাদ হয়তো ভাবছে তারা পারমাণবিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। কিন্তু প্রতিটি নতুন সংঘাত দুই দেশকে পারমাণবিক যুদ্ধের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। গত এক দশকের প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী যুদ্ধটি গত বছরের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। তবে আপাতত আশার কথা হলো, দুই দেশই এই বড় বিপদ সম্পর্কে সচেতন এবং তারা এমন পরিস্থিতি এড়াতে চাইছে।

মাইকেল কুগেলম্যান আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক একজন সিনিয়র ফেলো। টাইম থেকে অনূদিত।