যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় পিতার গুলিতে নিজের সন্তানসহ আট শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের শ্রিভেপোর্ট শহরে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত এক ব্যক্তির নির্বিচার গুলিবর্ষণে অন্তত আট শিশু প্রাণ হারিয়েছেন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে সাতজনই ওই ঘাতকের নিজের সন্তান। রোববার (১৯ এপ্রিল) সকালে তিনটি ভিন্ন স্থানে সংঘটিত এই বীভৎস হামলায় আরও দুই ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন ঘাতকের স্ত্রীও রয়েছেন।
ঘাতকের পরিচয় ও হামলার বিবরণ
শ্রিভেপোর্ট পুলিশ বিভাগের মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, ৩১ বছর বয়সী শামার এলকিন্স নামের ওই ঘাতক শিশুদের অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেন। হামলার পর এলকিন্স একটি গাড়ি ছিনতাই করে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তার সংঘর্ষ হয় এবং একপর্যায়ে তিনি গুলিতে নিহত হন। তবে এটি পুলিশের গুলিতে মৃত্যু নাকি আত্মঘাতী হামলা, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘাতকের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও পারিবারিক তথ্য
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও এলকিন্সের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘাতক শামার এলকিন্স দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন এবং সম্প্রতি তিনি আত্মহত্যার চিন্তার কথা প্রকাশ করেছিলেন। তার মা মাহেলিয়া এলকিন্স ও সৎ বাবা মার্কাস জ্যাকসন জানান, ইস্টার সানডের দিন এলকিন্স কান্নাকাটি করে ফোন দিয়েছিলেন এবং উল্লেখ করেছিলেন যে তার স্ত্রী শানিকা পুঘ বিবাহবিচ্ছেদ চাইছেন। সেই সময় এলকিন্স নিজেকে ‘অন্ধকার চিন্তায়’ ডুবে থাকার কথা বলেছিলেন।
সাবেক সেনা সদস্য এবং ইউপিএস-এর কর্মী এলকিন্সের বিরুদ্ধে এর আগে ২০১৬ সালে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং ২০১৯ সালে বেআইনিভাবে অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। ২০১৯ সালের আরেকটি ঘটনায় এলকিন্স একটি স্কুলের কাছে জনাকীর্ণ এলাকায় গুলি চালিয়েছিলেন, যার একটি বুলেট শিশুদের খেলার মাঠের কাছে পাওয়া গিয়েছিল। এলকিন্সের পরিচিতরা জানান, তাকে মাঝেমধ্যেই প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকতে দেখা যেত এবং উত্তেজনার কারণে তিনি নিজের চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতেন।
নিহত শিশু ও আহতদের অবস্থা
এই ঘটনায় এলকিন্সের স্ত্রী শানিকা পুঘ মাথায় ও পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এলকিন্সের পরিবারের সদস্যরা জানান, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী নিহত শিশুরা অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও সক্রিয় ছিল। ঘাতকের মা জানান, কয়েক দিন আগেই তিনি নাতি-নাতনিদের খোঁজ নিয়েছিলেন এবং এলকিন্সও সব ঠিক আছে বলে জানিয়েছিলেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শোকবার্তার মাধ্যমে তিনি প্রথম জানতে পারেন যে তার নিজের ছেলেই এই বীভৎস ঘটনা ঘটিয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও চলমান তদন্ত
শ্রিভেপোর্টের মেয়র টম আর্সেনো এই পরিস্থিতিকে শহরের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেন তিনি হঠাৎ নিজের সন্তানদের ওপর এমন নৃশংস হয়ে উঠলেন, তা এখনো রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে। লুইজিয়ানা ন্যাশনাল গার্ডের সাবেক এই সদস্যের অতীত ইতিহাস এবং বর্তমান মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে পুলিশ এই মর্মান্তিক ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা ব্যবস্থা ও হস্তক্ষেপের অভাবে এমন ট্র্যাজেডি ঘটতে পারে।



