শিশু হত্যা ও যৌন সহিংসতার ঘটনায় মনোচিকিৎসকের বিশ্লেষণ
একজন শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা ও হত্যার মতো অপরাধ সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং হতভম্ব করে তোলে। মনোচিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীরা সাধারণত এই ধরনের অপরাধ ব্যাখ্যা করতে কয়েকটি স্তর বা কারণের কথা উল্লেখ করেন। তবে তারা এটাও স্পষ্টভাবে মনে রাখতে বলেন যে, সব মানুষ একরকম হয় না এবং প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিশ্বাসের সংকট ও নিরাপত্তা প্রশ্ন
এ ধরনের ঘটনা যখন শুনতে পাই, তখন প্রথম যে প্রশ্ন সামনে আসে তা হলো— তাহলে বিশ্বাস করবো কাকে? প্রতিবেশীর কাছে সন্তান নিরাপদ না হলে, মানুষ কোথায় দাঁড়াবে? সম্প্রতি চট্টগ্রামের ইকোপার্কে শিশু হত্যার ঘটনার সঙ্গে প্রতিবেশীর জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে, যা এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। বাংলা ট্রিবিউন এই ঘটনা নিয়ে মনোচিকিৎসক মেখলা সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে, যিনি অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।
মনোচিকিৎসক মেখলা সরকারের মূল্যবান বক্তব্য
মনোচিকিৎসক মেখলা সরকার বলেন, ‘সব মানুষ এক না। কিছু মানুষের মধ্যে এসব দেখা যায়, তাদের নিজের স্বার্থে যেকোনও পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। বেশিরভাগ মানুষ ভালো। তবে একথা মনে রাখতে হবে, বাবা-মা ছাড়া কারও হাতেই সন্তানকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। যদি কোনও কারণে ছেড়ে যেতে হয় তবে যার কাছে ছাড়ছেন তাকে মনিটরিংয়ে রাখতে হবে। এরকমভাবে শিশুকে আক্রমণ বা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠা সহজ না, এটা হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিষয় না। এই অপরাধী ব্যক্তির মানসিকতা হঠাৎ এরকম হয়েছে তা নয়, তার বেড়ে ওঠার মধ্যে কোথাও ঘাটতি থেকে গেছে। মানুষ ইচ্ছার দাস। ইগো স্যাটিসফাই করতে চায়। বিবেক শক্তিশালী থাকলে বাস্তবতা পারমিট করলেও সে নেতিবাচক কোনও কাজ করতে পারবে না।’
অপরাধের গভীর কারণসমূহ
তাহলে আর কী কী কারণে ওই ধরনের কাজে লিপ্ত হয় মানুষ? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে এটি কেবল যৌন তাড়না নয়; বরং ক্ষমতা, দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিকৃত আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। যেমনটা বলছিলাম, গবেষণায় দেখা যায়, কিছু অপরাধীর নিজের শৈশবেই সহিংসতা, নির্যাতন বা অবহেলার অভিজ্ঞতা থাকে। তা সবার ক্ষেত্রে অপরাধে রূপ নেয় না, কিন্তু অমীমাংসিত ট্রমা, সহানুভূতির ঘাটতি ও বিকৃত আত্ম-ধারণা ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আবার, চরম সহিংসতার পেছনে প্রায়ই অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতার ঘাটতি দেখা যায়। নৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে মানুষ নিজের ইচ্ছাকেই একমাত্র সত্য মনে করতে শুরু করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ব্যক্তিত্ব বিকার, শিশু-কেন্দ্রিক যৌন আকর্ষণের মতো মানসিক সমস্যা থাকতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সব মানসিক অসুস্থ ব্যক্তি সহিংস নন, এবং অধিকাংশই কখনও অপরাধ করেন না। এমন অপরাধ কেবল ‘পাগলামি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ইচ্ছাকৃত, ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও নৈতিকভাবে বিকৃত সিদ্ধান্ত; যেখানে ব্যক্তি জানে কাজটি ভুল, তবু সে করে।’
চট্টগ্রামের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
খবরে প্রকাশ, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে চকলেটের লোভ দেখিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আট বছরের মেয়েটিকে নিয়ে যায় প্রতিবেশী বাবু শেখ (৪৫)। সেখানে মেয়েটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। সে সময় চিৎকার করলে শিশুটিকে মারধরের পর গলায় ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে মারা গেছে ভেবে তাকে ফেলে যায় বাবু শেখ। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানায় সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন।
এই ঘটনা শিশু নিরাপত্তা ও সামাজিক বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে, যা মনোচিকিৎসকদের বিশ্লেষণে আরও গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে।
