বিদায়ী বছরে ৪০০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা: স্কুল পর্যায়ে সর্বোচ্চ, নারীদের হার উদ্বেগজনক
বিদায়ী বছরে ৪০০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, স্কুলে সর্বোচ্চ

বিদায়ী বছরে ৪০০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা: স্কুল পর্যায়ে সর্বোচ্চ, নারীদের হার উদ্বেগজনক

গত বছর সারা দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মোট ৪০০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। আঁচল ফাউন্ডেশন পরিচালিত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট শীর্ষক সমীক্ষায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে দেশি-বিদেশি মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষা পর্যায়ভিত্তিক বিভাজন: স্কুল শিক্ষার্থীরা শীর্ষে

সমীক্ষায় দেখা গেছে, আত্মহত্যাকারী ৪০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে স্কুল পর্যায়ের সংখ্যা ১৯০ জন, যা মোটের ৪৭.৪০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা সাধারণত কৈশোরের সূচনালগ্নে থাকে, যখন তাদের মানসিক ও আবেগীয় বিকাশ অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে অবস্থান করে। কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন (২২.৮ শতাংশ), বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন (১৯.১০ শতাংশ) এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন (১০.৭২ শতাংশ) শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণ: নারী শিক্ষার্থীদের হার বেশি

লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৯ জন বা ৬১.৮ শতাংশ নারী এবং ১৫৪ জন বা ৩৮.২ শতাংশ পুরুষ আত্মহত্যা করেছেন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। স্কুলে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ; কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য বেশি, যেখানে ৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। মাদ্রাসায় ২৪ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে।

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণ: হতাশা ও অভিমান প্রধান

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হতাশা ২৭.৭৯ শতাংশ এবং অভিমান ২৩.৩২ শতাংশ নিয়ে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। হতাশার ক্ষেত্রে নারী ৬২ জন (৫৫.৩৫ শতাংশ) ও পুরুষ ৫০ জন (৪৪.৬৫ শতাংশ), অভিমানে নারী ৫৮ জন (৬১.৭০ শতাংশ) ও পুরুষ ৩৬ জন (৩৮.২৯ শতাংশ) আত্মহত্যা করেছেন। একাডেমিক চাপে ৭২ জন আত্মহত্যা করেছে, যার অধিকাংশই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং এতে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সর্বাধিক (৭০.৮৩ শতাংশ)।

  • প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন বা ১৩.১৫ শতাংশ
  • পারিবারিক টানাপোড়েনে ৩২ জন বা ৭.৯৪ শতাংশ
  • মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন বা ৬.২০ শতাংশ
  • যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন বা ৩.৪৭ শতাংশ
  • সাইবার বুলিংয়ের কারণে ১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন

বিভাগভিত্তিক চিত্র: ঢাকায় সর্বোচ্চ

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৮ জন বা ২৯.২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৩ জন (১৫.৬৩ শতাংশ), বরিশাল বিভাগে ৫৭ জন (১৪.৪ শতাংশ) এবং রাজশাহী বিভাগে ৫০ জন (১২.৪০ শতাংশ) শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, এটি কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত একটি সংকট।

বয়সভিত্তিক তথ্য: কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে হার বেশি

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ৬৬.৫০ শতাংশ, যা মোট আত্মহননকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তাদের মধ্যে ১৯০ জন নারী ও ৭৮ জন পুরুষ। কৈশোরকালীন আবেগীয় অস্থিরতা, পরিচয় সংকট, প্রেমঘটিত টানাপোড়েন, একাডেমিক চাপ এবং সামাজিক তুলনা সব মিলিয়ে এ বয়সটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ২২.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যেখানে পুরুষের সংখ্যা ৫১ এবং নারীর সংখ্যা ৪০। ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ৪৪ জন বা ১০.৯ শতাংশ শিশুর আত্মহত্যা আমাদের জন্য গভীর হৃদয়বিদারক বাস্তবতা।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিশদ চিত্র

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৪ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের, ১৭ জন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের, মেডিক্যাল কলেজের ৬ জন ও ১০ জন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর চেয়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার বেশি, যা মোট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ৫৯.১ শতাংশ। এটি অনেকটাই প্রতিযোগিতা, সেশনজট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ও পুরুষ সমান হারে আত্মহত্যা করেছে, যা মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র।

স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অভিমান ও একাডেমিক চাপ প্রধান কারণ

১৯০ জন স্কুল শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ৩২.৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী অভিমানের কারণে আত্মহত্যা করেছে। একাডেমিক চাপ ছিল দ্বিতীয় প্রধান কারণ, যা মোট ঘটনার ২৩.৬৯ শতাংশ। এছাড়া হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে ১৯.৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। প্রেমঘটিত কারণে আত্মহত্যার হার ৮.৯৫ শতাংশ এবং পারিবারিক টানাপোড়েনে ৮.৪২ শতাংশ। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪.২২ শতাংশ এবং মানসিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২.৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে বোঝা যায়, আবেগনিয়ন্ত্রণ ও পারিবারিক সহায়তার ঘাটতি স্কুল পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা মোকাবেলায় আঁচল ফাউন্ডেশনের পাঁচ প্রস্তাবনা

  1. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মনোসেবার এবং শিক্ষার্থীদের মেন্টাল হেলথ স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা।
  2. শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের চিহ্ন শনাক্ত করতে শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রশিক্ষণ।
  3. আত্মহত্যা ও মানসিক সমস্যার ওপর সামাজিক স্টিগমা কমাতে সংবাদ, পোস্টার ও সামাজিক মাধ্যম প্রচারণা।
  4. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাইকো সোশ্যাল প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।
  5. অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংযোগ ঘটাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ক কর্মসূচির আয়োজন করা।

আঁচল ফাউন্ডেশন দেশের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ১০০টি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কনসালট্যান্ট ফরেন্সিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. আনিস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মাহফুজুল আলম, টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজের সহকারী পরিচালক ডা. মারুফ আহমেদ খান, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সোহেল মামুন এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তানসেন রোজ।