মৌলভীবাজারে মানসিক রোগে আক্রান্ত কিশোরকে শিকলবন্দী করে রাখা মায়ের মর্মান্তিক কাহিনী
মৌলভীবাজারে মানসিক রোগে আক্রান্ত কিশোর শিকলবন্দী

মৌলভীবাজারে মানসিক রোগে আক্রান্ত কিশোরকে শিকলবন্দী করে রাখা মায়ের মর্মান্তিক কাহিনী

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌরসভার নতুনপাড়া এলাকায় একটি কলোনিতে বসবাস করছেন নাজু বেগম ও তার তিন সন্তান। তাদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী জিহাদ আহমদ মানসিক রোগে আক্রান্ত। দারিদ্র্যের কারণে চিকিৎসা করাতে না পেরে মা নাজু বেগম ছেলেকে শিকলবন্দী করে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। গত বুধবার স্থানীয় একটি কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, বারান্দার মেঝেতে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় জিহাদ শুয়ে আছে।

দারিদ্র্য ও নির্যাতনের পটভূমি

নাজু বেগমের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্টকর। তিনি বলেন, স্বামী জামাল মিয়ার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে সাত-আট বছর আগে তিন সন্তানকে নিয়ে কুলাউড়ায় চলে আসেন। বর্তমানে গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালান। তার উপার্জন দিয়ে দুই মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। এ অবস্থায় ছেলে জিহাদের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তার নেই।

জিহাদের বড় বোন মীম আক্তার কুলাউড়া সরকারি কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। ছোট বোন জুনাইসা বেগম স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু জিহাদ লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারেনি এবং মানসিক সমস্যার কারণে মাদ্রাসায় যেতে চাইত না।

মানসিক রোগের ইতিহাস ও চিকিৎসার অভাব

নাজু বেগম জানান, জিহাদের মানসিক সমস্যা শুরু হয় ছয়-সাত বছর বয়সে। মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর পর বছরখানেক ভালো চললেও পরে সে রেগে যেত এবং ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করত। একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে প্রাথমিক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, যা মাসে তিন-চার হাজার টাকা খরচ হতো। স্থানীয় এক সচ্ছল ব্যক্তির সাহায্যে কিছুদিন ওষুধ চললেও তিনি মারা যাওয়ার পর অর্থসংকটে ওষুধ বন্ধ হয়ে যায়।

ওষুধ বন্ধ হওয়ার পর জিহাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। নাজু বেগম বলেন, ‘কেউর যদি ক্ষতি করে এই ডরে ছেলেরে শিকল পরাই রাখি। দিনে বারান্দায় রাখি। কাজ শেষ করি আইয়া তারে গোসল করাই, খাওয়াদাওয়া করাই। রাইতে ঘরে থাকে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, চিকিৎসক প্রতিদিন ইনজেকশন দিতে এবং সিটিস্ক্যান পরীক্ষা করাতে বলেছেন, কিন্তু সাত-আট হাজার টাকার এই খরচ তিনি বহন করতে পারছেন না।

চিকিৎসকের মতামত ও আশার আলো

সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ এনাম জিহাদের চিকিৎসা করছেন। তিনি জানান, প্রাথমিক পরীক্ষায় জিহাদের ‘নিউরো-সাইকিয়াট্রিক’ সমস্যা ধরা পড়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত ব্যবহারে সে সুস্থ হয়ে উঠবে বলে তিনি আশাবাদী। চিকিৎসক আরও বলেন, এখন জিহাদকে শিকলবন্দী করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।

নাজু বেগমের কান্নাভরা কথায় ফুটে উঠেছে মায়ের বেদনা: ‘এই বয়সে ছেলেটারে কি এইভাবে আটকাইয়া রাখার কথা। নিজের অনেক কষ্ট হয়। তার মতো ছেলেরা স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে; আর সে বন্দী। আমার ছেলেটা যে কোন দিন সুস্থ হইব আল্লাহই জানেন।’

এই ঘটনা সমাজে দারিদ্র্য ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ঘাটতির চিত্র তুলে ধরছে। নাজু বেগমের মতো অসহায় পরিবারগুলোর জন্য সহায়তা ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।