পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন শিশুদের মানসিক শক্তি বাড়ানোর উপায় বের করেছেন গবেষকরা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে মাত্র ৪০ শতাংশকে ‘ভালোভাবে বিকশিত’ বলা যায়। গবেষণাটির নেতৃত্বে দেওয়া ক্রিশ্চিয়ানা ডি বেথেল ব্যাখ্যা করেছেন, শিশুদের ভালোভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবারের সহনশীলতা ও পারস্পরিক যোগাযোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক যত দৃঢ় হয়, শিশুর মানসিক বিকাশ তত ভালো হয়।
অভিভাবকেরা প্রায়ই চিন্তা করেন, ঠিক কীভাবে সন্তানকে বড় করলে জীবনের কঠিন সময়েও তারা টিকে থাকতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরতে হবে এক শতাব্দী আগে, বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবনে। আইনস্টাইনের ছিল তিন সন্তান। তাঁর প্রথম স্ত্রী মিলেভা মেরিকের সঙ্গে তাঁর ছিল এক মেয়ে ও দুই ছেলে। তাঁদের ছোট ছেলে এডওয়ার্ড আইনস্টাইন ছিল খুব মেধাবী। সে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে এক মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়, যা তার জীবনের পথ বদলে দেয়। জীবনের বড় একটি সময় তাকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরের একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে কাটাতে হয়েছে। আইনস্টাইন তাঁর ছেলেকে বর্ণনা করেছিলেন ‘সংবেদনশীল স্নায়ুতন্ত্রের অধিকারী’ হিসেবে।
আইনস্টাইনের চিঠির শিক্ষা
১৯৩০ সালে ছেলেকে লেখা এক চিঠিতে আইনস্টাইন লিখেছিলেন, জীবনটা অনেকটা সাইকেল চালানোর মতো। ভারসাম্য রাখতে হলে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। জীবনে যত বাধাই আসুক, থেমে গেলে চলবে না। চলতে থাকাই হলো টিকে থাকার একমাত্র উপায়। এখন আমরা জানব, কীভাবে দৃঢ় হওয়া যায়।
নিজের যত্ন নাও
শিশু-কিশোরদের মানসিক শক্তি অনেকটাই নির্ভর করে তার চারপাশের বড়দের ওপর। বাবা-মা যদি নিজেরাই ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন বা ভেঙে পড়া অবস্থায় থাকেন, তাহলে সেই প্রভাব শিশুর মনেও পড়ে। তাই সন্তানের ভালো চাইলে আগে নিজের যত্ন নেওয়া জরুরি। নিজের শরীর ও মনের দিকে খেয়াল রাখা, প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নেওয়া, কারও সঙ্গে কথা বলা—এসব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সুস্থ ও শান্ত অভিভাবক শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠেন। সেই আশ্রয় থেকেই শিশুর মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা গড়ে ওঠে।
রুটিন মেনে চলো
নিয়মিত জীবনযাপন শিশুর মনে একধরনের স্থিরতা তৈরি করে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, পড়াশোনা করা, খেলাধুলা করা—এসব ছোট ছোট অভ্যাসই বড় প্রভাব ফেলে। যখন জীবন খুব অগোছালো হয়ে যায়, তখন মনও অস্থির হয়ে পড়ে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট রুটিন থাকলে শিশু-কিশোরেরা জানে, কখন কী করতে হবে। এতে তাদের ভেতরে একধরনের নিরাপত্তাবোধ জন্মায়। এই নিরাপত্তাবোধই কঠিন সময়েও তাদের ভেঙে পড়তে দেয় না। নিয়ম মানা শুধু শৃঙ্খলা না, এটি মানসিক শক্তি গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কথা বলো
অনেক সময় শিশুরা তাদের ভয়, দুঃখ বা উদ্বেগ নিজের ভেতরেই চেপে রাখে। তারা ভাবে, এসব কথা বললে হয়তো কেউ বুঝবে না, বা গুরুত্ব দেবে না। কিন্তু ভেতরে জমে থাকা এই অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে মনকে ভারী করে তোলে। তাই কথা বলা খুব জরুরি। বিশ্বাস করো এমন মানুষ, যেমন বাবা-মা, বন্ধু বা শিক্ষক, যার সঙ্গেই হোক, নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিয়ে মনকে হালকা করো। যখন কেউ মন দিয়ে শোনে, তখন শিশুর মনে হয় সে একা না। এই অনুভূতিই শিশুকে নতুন করে শক্তি দেয়। কঠিন সময় পার করার সাহস জোগায়।
সাফল্য মনে রাখো
আমরা অনেক সময় শুধু ব্যর্থতার কথা বেশি মনে রাখি। সাফল্যের মুহূর্তগুলো ভুলে যাই। কিন্তু ছোট ছোট সাফল্যই আমাদের বড় শক্তি দেয়। শিশু-কিশোরদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, তারা আগে কোথায় ভালো করেছে, কীভাবে কোনো কঠিন কাজ শেষ করেছে। এই স্মৃতিগুলো তাদের ভেতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। তারা বুঝতে পারে, আগে পারলে এবারও পারব। অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের সাহস হয়ে ওঠে। তাই নিজের ভালো দিকগুলো মনে রাখা, নিজের অর্জনগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া, এসব দৃঢ় হয়ে ওঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সূত্র: ইয়াহু নিউজ



