বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই ঘরে ঘরে বাড়ছে জ্বরের প্রকোপ। বৃষ্টির পানিতে ভেজা কিংবা আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে অনেকেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবে এই সময়ে যেকোনো জ্বরকে সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে অবহেলা করা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি এবং দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের মতো মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাই জটিলতা এড়াতে এই রোগগুলোর লক্ষণের পার্থক্য জানা এবং সঠিক সময়ে পরীক্ষা করা জরুরি।
বর্ষাকালে জ্বর কেন বাড়ে?
ভারী বর্ষণের ফলে বিভিন্ন স্থানে, যেমন—ফ্লাওয়ার পট, এয়ার কুলার বা নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকে। এই জমে থাকা স্থির পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়, যা ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী। এছাড়া বন্যার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে খাবার পানি দূষিত হয়ে টাইফয়েডের ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়। আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে এই সময়ে যেকোনো ভাইরাস বাতাসে দ্রুত ছড়াতে পারে।
- ডেঙ্গু: এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।
- টাইফয়েড: দূষিত খাবার ও পানি পানের মাধ্যমে ছড়ায়।
- সাধারণ সর্দি: বদ্ধ বা কম বাতাস চলাচলকারী স্থানে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে ছড়ায়।
লক্ষণ দেখে রোগ চেনার উপায়
এক নজরে ডেঙ্গু, টাইফয়েড ও সাধারণ সর্দির মূল পার্থক্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- সাধারণ সর্দি-কাশি: নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, গলা ব্যথা ও হালকা কাশি। এর স্থায়িত্ব সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন।
- ডেঙ্গু: তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, প্রচণ্ড পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, শরীরে র্যাশ ও বমি ভাব। এর স্থায়িত্ব চিকিৎসা ও প্লাটিলেট কাউন্টের ওপর নির্ভর করে।
- টাইফয়েড: দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, পেটে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া এবং তীব্র ক্লান্তি। সঠিক চিকিৎসা না পেলে দিন দিন অবস্থার অবনতি হয়।
জরুরি সতর্কতা
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, অনবরত বমি হওয়া, তীব্র পেটে ব্যথা এবং মাথা ঘোরার মতো লক্ষণ দেখা দিলে কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ: কখন পরীক্ষা করাবেন?
ভারতের ফোর্টিস এসকর্টস হার্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র কনসালটেন্ট পালমোনোলজিস্ট ড. অ্যাভি কুমার বলেন, ‘হালকা জ্বরের সঙ্গে হাঁচি-কাশি থাকলে তা সাধারণত সর্দি-কাশি। তবে জ্বর যদি ৩৯° সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায় এবং শরীরে তীব্র ব্যথা থাকে, তবে তা ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে। আবার পেটের সমস্যার সঙ্গে একটানা জ্বর থাকলে তা টাইফয়েডের ইঙ্গিত দেয়।’
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অঙ্কিতা বৈদ্য জানান, জ্বর যদি একটানা হয়, তীব্র মাত্রার হয় কিংবা শ্বাসকষ্ট ও চরম ক্লান্তি থাকে, তবে চিকিৎসকরা সাধারণ সর্দির বাইরে অন্য মারাত্মক কারণগুলো খতিয়ে দেখেন।
নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো উচিত:
- জ্বর যদি ২-৩ দিনের বেশি স্থায়ী হয়।
- হঠাৎ তীব্র জ্বর আসার সঙ্গে শরীর ও জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা হলে।
- খাওয়ার রুচি একদম চলে গেলে বা পেটে তীব্র সমস্যা দেখা দিলে।
- ত্বকে কোনো বিশেষ র্যাশ বা লালচে দাগ দেখা দিলে।
নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
লক্ষণ দেখে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দিয়ে থাকেন:
- ডেঙ্গুর জন্য: এনএস১ অ্যান্টিজেন টেস্ট, ডেঙ্গু আইজিএম/আইজিজি টেস্ট এবং প্লাটিলেট কাউন্ট চেক করার জন্য সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট)।
- টাইফয়েডের জন্য: ব্লাড কালচার, টাইফয়েড অ্যান্টিবডি টেস্ট এবং সিবিসি।
- সাধারণ সর্দির জন্য: শারীরিক পরীক্ষা এবং লক্ষণের ইতিহাস পর্যালোচনা।
বর্ষাকালীন জ্বর প্রতিরোধের ৭টি উপায়
- বাড়ির আশেপাশে কোথাও পানি জমতে দেবেন না।
- মশার কামড় থেকে বাঁচতে মসকুইটো রিপেলেন্ট (মশা তাড়ানোর ক্রিম বা স্প্রে) ব্যবহার করুন।
- শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরিধান করুন।
- সর্বদা নিরাপদ, ফুটানো বা ফিল্টার করা পানি পান করুন।
- বাসি খাবার পরিহার করে ঘরে তৈরি গরম ও তাজা খাবার খান।
- খাবার খাওয়ার আগে এবং বাইরে থেকে ফিরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
- ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
বর্ষার এই সময়ে সামান্য সচেতনতাই আপনাকে ও আপনার পরিবারকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে। লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই ঘরে বসে না থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সূত্র: এনডিটিভি



