টানা ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে, ফলে আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের অন্তত ১৭টি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানিয়েছে, এ সময়ে বেশ কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টিতে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত
মঙ্গলবারের আবহাওয়া বুলেটিন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, অন্যদিকে সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়েছে। ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যেও ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী চার দিন চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে এবং ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গের উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে
এফএফডব্লিউসি বলছে, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, যার ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে সাময়িক বন্যা দেখা দিতে পারে। গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির কিছু এলাকায় বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চলেও সাময়িক বন্যার শঙ্কা রয়েছে।
মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যদুকাটা ও ভুগাই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে, যা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার ঝুঁকি বাড়াবে। উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে, ফলে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে।
ভূমিধসের শঙ্কায় বান্দরবান
বান্দরবান জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সেখানে টানা বৃষ্টিতে সাতটি উপজেলার পাদদেশে বসবাসরত প্রায় ৩০ হাজার পরিবার ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা শুরু করেছে, ১২০টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে এবং আটটি মেডিকেল টিম গঠন করেছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বাড়ায় থানচি, রুমা, লামা ও আলীকদম উপজেলায় বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। রুমার কেওক্রাডং এলাকায় ৫০ জনের বেশি পর্যটক আটকা পড়েছেন, তবে থানচি ও রেমাক্রি এলাকায় আটকে পড়া পর্যটকদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবক গাইডরা নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছেন। জেলা প্রশাসন প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুক্রবার পর্যন্ত সব পর্যটন কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক মঞ্জুরুল আলম বলেন, 'গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছি।' জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের ভূমিধসপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাত উপজেলায় মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে এবং ১২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, আটটি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।
কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি
টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের নয়টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, টেকনাফ, উখিয়া, ঈদগাঁও ও কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। বাকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে এবং পাহাড়ি ঢলে শত শত পরিবার আটকা পড়েছে। গত দুই দিনে ভূমিধসে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, এক হাজারের বেশি বাসিন্দাকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি বসতি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের মধ্যে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। টানা পাঁচ দিন যান চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। কুতুবদিয়ায় একটি সেতু ভেঙে পড়ায় স্থানীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. এ. মান্নান বলেন, বৃষ্টি কমায় সার্বিক পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। কক্সবাজার শহর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে অন্তত এক হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুর্যোগ
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে অন্তত ১০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ১০ জন আহত হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার ৮১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩ হাজার ১৮২ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ৫২টি ভূমিধস, ১৪টি বন্যা ও ৮৩টি ঝড়জনিত ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টিপাত
চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার ফলে শহরের অনেক এলাকা হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ব্যাপক জলাবদ্ধতা, তীব্র যানজট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে। বন্যাকবলিত রেললাইনের কারণে কক্সবাজারগামী ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস ট্রেনটি প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে কয়েক ঘণ্টা আটকা পড়ে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট করা হয়েছে, একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে রাজধানীতে ফিরে গেছে। বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট ডাইভার্ট করা হয়েছে, একটি চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় ফিরে গেছে। বিমানবন্দরে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার। আবহাওয়ার উন্নতি হলে স্বাভাবিক ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে।
রাঙ্গামাটিতে প্রাণহানি
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় ভূমিধসে একটি গাছ চাপায় এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। কাপ্তাইয়ে ভূমিধস ও গাছ পড়ায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষ জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দিয়েছে এবং পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সর্বোচ্চ সতর্কতা
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জরুরি সতর্কতায় রাখা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা চলছে, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, পর্যটন স্পট বন্ধ রাখা হয়েছে এবং উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যার ফলে বন্যা, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।



