মাদকাসক্তের কারাগারে যাওয়ার আবেদন: শাস্তি নাকি চিকিৎসা?
মাদকাসক্তের কারাগারে যাওয়ার আবেদন: শাস্তি নাকি চিকিৎসা?

রাজশাহীর গোদাগাড়ীর একটি ঘটনা আমাদের আইন, জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি টানা তিন দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গিয়ে নিজেকে কারাগারে পাঠানোর অনুরোধ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনোভাবেই তিনি মাদকের নেশা ছাড়তে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর একটি ধারায় পাঁচ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

ঘটনার আইনগত বিশ্লেষণ

ঘটনাটি নিছক একটি ব্যতিক্রমী সংবাদ নয়, এটি রাষ্ট্রের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে— একজন মানুষ যখন নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে রাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চান, তখন রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? শাস্তি, নাকি চিকিৎসা?

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে স্বেচ্ছায় কারাবরণের কোনও বিধান নেই। কারাদণ্ড কোনও চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নয়, এটি অপরাধের জন্য আদালতের আরোপিত শাস্তি। ফলে কেবল কোনও ব্যক্তি কারাগারে যেতে চান বলেই তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়ার সুযোগ নেই। শাস্তি আরোপের পূর্বশর্ত হলো— সংশ্লিষ্ট আইনে বর্ণিত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং তার প্রয়োজনীয় উপাদান আইনসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর অধীনে দণ্ড দিয়েছেন। তবে সংবাদে এমন কোনও তথ্য নেই যে, তাঁর কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হয়েছে বা তিনি ঘটনাস্থলে মাদক সেবনরত অবস্থায় ধরা পড়েছেন। যদি কেবল তাঁর নিজের বক্তব্যের ভিত্তিতেই দণ্ড প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় অপরাধ প্রমাণের যে মৌলিক নীতিমালা রয়েছে, তা এ ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে? বিষয়টি আইনগত ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের চেতনা

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮’ কেবল শাস্তির আইন নয়। আইনটির উদ্দেশ্যের মধ্যেই মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ আইনটি আসক্তিকে শুধু অপরাধের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, একটি জনস্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সমস্যা হিসেবেও বিবেচনা করেছে। তাই একজন ব্যক্তি যখন স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রের কাছে এসে নিজের আসক্তির কথা স্বীকার করে মুক্তি কামনা করেন, তখন তাঁর ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগগুলো সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়াই আইনটির সামগ্রিক চেতনার সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কিছু ব্যবস্থা রয়েছে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। বেসরকারি পর্যায়েও বহু পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ব্যয় বেশিরভাগ অসচ্ছল পরিবারের নাগালের বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সমাজসেবা অধিদফতরের সমন্বয়ে সরকারি চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের কোনও বিকল্প এ ক্ষেত্রে খোঁজা সম্ভব ছিল কি না—সেই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক।

ইউএনও'র সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা

এখানেই সংশ্লিষ্ট ইউএনও'র সিদ্ধান্তটি নীতিগতভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। নিঃসন্দেহে তিনি মানবিক বিবেচনা থেকেই সিদ্ধান্তটি নিয়ে থাকতে পারেন। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরাও তাঁকে কারাগারে পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্ত কেবল মানবিক অনুভূতির ওপর নির্ভর করতে পারে না, তার দৃঢ় আইনগত ভিত্তি থাকতে হয়। বিশেষ করে যখন সেই সিদ্ধান্তের ফলে একজন মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত হয়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যাশা ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সরকারি কোনও মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার সুযোগ পেতে পারেন কিনা, অথবা স্বাস্থ্য বিভাগ, কিংবা সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে তাঁকে কোনও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আনা যায় কিনা— সেই সম্ভাবনাগুলো আগে বিবেচনা করা হবে। বাস্তবে এসব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার কারণে কারাগারকে কার্যত চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা একটি দেশের আইন, জনস্বাস্থ্যনীতি এবং মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নমুক্ত নয়।

অনাকাঙ্ক্ষিত নজির ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য একটি অনাকাঙ্ক্ষিত নজির তৈরি করতে পারে। যদি চিকিৎসাপ্রার্থী একজন মাদকাসক্তকে কারাদণ্ড দেওয়াই গ্রহণযোগ্য প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে চিকিৎসার পরিবর্তে শাস্তির পথই সহজ সমাধান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন, ২০০৯-এর উদ্দেশ্যও মনে রাখতে হবে। এই আইন মূলত তাৎক্ষণিকভাবে সংঘটিত এবং প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণযোগ্য কিছু অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত। অন্যদিকে, মাদকাসক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সমস্যা। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সকলের করণীয় সীমারেখা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গোদাগাড়ীর ঘটনাটি আমাদের একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কিন্তু একজন চিকিৎসা প্রার্থীর গন্তব্য কারাগার নয়, চিকিৎসাকেন্দ্র হওয়াই একটি মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের পরিচয়।