সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী, নিয়মিত মাচা পান করলে রক্তাল্পতা, আয়রনের ঘাটতি এবং চুল ঝরার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই তথ্য বিশেষ করে মাচাপ্রেমীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। তবে পুষ্টিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয় এবং সঠিক জ্ঞান থাকলে মাচা নিরাপদ ও উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
ভিয়েতনামের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীন হাসপাতাল ১৯-৮-এর পুষ্টি ও ডায়েট বিভাগীয় প্রধান ড. লে থি হুয়ং জিয়াং জানান, এ ধরনের দাবি শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুষ্টির ক্ষেত্রে কোনও খাবারকে দ্রুত বাতিল করা ঠিক নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, কী পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে, কখন খাওয়া হচ্ছে, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা কী এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস কেমন।’
মাচা কী এবং এতে কী থাকে
মাচা হলো বিশেষ ধরনের জাপানি সবুজ চা, যা ছায়ায় উৎপাদিত চা পাতাকে খুব সূক্ষ্ম গুঁড়ো করে তৈরি করা হয়। এতে উচ্চমাত্রার পলিফেনল, ক্যাটেচিন (বিশেষ করে ইজিসিজি), ক্যাফেইন এবং এল-থিয়ানিন থাকে। সাধারণ সবুজ চায়ের মতো এটি ছেঁকে ফেলা হয় না, বরং পুরো পাতা পানিতে বা দুধে মিশিয়ে গ্রহণ করা হয়, ফলে এর উপাদান সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে।
আয়রন শোষণে প্রভাব কি সত্যি
গবেষণা অনুযায়ী, মাচায় থাকা পলিফেনল ও ট্যানিন পরিপাকতন্ত্রে নন-হিম আয়রনের (উদ্ভিদ-ভিত্তিক আয়রন) সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যা আয়রন শোষণ কিছুটা কমাতে পারে। এই ধরনের আয়রন সাধারণত শাকসবজি, ডাল ও শস্যজাত খাবারে পাওয়া যায়। ড. জিয়াং জানান, ‘বৈজ্ঞানিকভাবে এটি সত্য যে মাচা বা চা জাতীয় পানীয় আয়রন শোষণ কমাতে পারে। তবে এর মাত্রা নির্ভর করে কতটা এবং কখন তা গ্রহণ করা হচ্ছে তার ওপর।’
‘রক্ত ধ্বংস হয়ে যায়’ এই দাবি কি সত্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়রন শোষণ কিছুটা কমা আর ‘রক্ত ধ্বংস হয়ে যাওয়া’—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, চা বা কফি খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করলে নন-হিম আয়রনের শোষণ কমতে পারে। তবে এটি সাধারণত তখনই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি করে, যখন দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করা হয় এবং খাদ্যাভ্যাসে পুষ্টির ঘাটতি থাকে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
ড. জিয়াং বলেন, ‘যাদের শরীরে আগে থেকেই আয়রনের ঘাটতি আছে বা যারা আয়রনসমৃদ্ধ খাবার কম খান, তাদের ক্ষেত্রে প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।’ অন্যদিকে, যারা সুষম খাদ্য গ্রহণ করেন—মাংস, মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য খান—তাদের ক্ষেত্রে মাচা পান করা সাধারণত কোনও বড় ঝুঁকি তৈরি করে না।
কীভাবে মাচা সঠিকভাবে পান করবেন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী:
- প্রধান খাবারের অন্তত ১-২ ঘণ্টা পর মাচা পান করা ভালো।
- আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে না খাওয়াই উত্তম।
- অতিরিক্ত পরিমাণে না খাওয়াই ভালো।
- সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই নিয়মগুলো অনুসরণ করলে আয়রন শোষণে সম্ভাব্য প্রভাব অনেকাংশে কমানো যায়।
পরিশেষে বলা যায়, মাচা কোনও ‘ক্ষতিকর পানীয়’ নয়। বরং এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য উপকারী উপাদান স্বাস্থ্যগত দিক থেকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যেকোনো খাবারের মতোই, এর সঠিক সময় ও পরিমাণ মেনে গ্রহণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



