ওয়াশ খাতে উন্নয়নের আড়ালে মানবাধিকার লঙ্ঘন: স্কুল-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৌলিক সেবার সংকট
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে টিউবওয়েল ও ল্যাট্রিনের বিস্তার একটি দৃশ্যমান সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হলেও, সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে এক রূঢ় বাস্তবতা। ‘ওয়াশ ইন এডুকেশনাল অ্যান্ড হেলথকেয়ার ফেসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’ এবং ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিআইসিএস) ২০২৫’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবকাঠামোর উপস্থিতি সত্ত্বেও মৌলিক সেবার গুণগত মান ও প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে ঘাটতিপূর্ণ। এটি কেবল সেবার অভাব নয়, বরং পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই ইঙ্গিত বহন করে।
সংবিধান ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ
ঐতিহ্যগতভাবে পানি ও স্যানিটেশনকে প্রকৌশলগত বিষয় হিসেবে দেখা হলেও, মানবাধিকারভিত্তিক পদ্ধতি অনুযায়ী অধিকার কেবল উৎসের উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদ জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য এবং ১৫(এ) অনুচ্ছেদ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্দেশ করে। এই প্রেক্ষাপটে, ওয়াশ খাতের ঘাটতিগুলো সরাসরি নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে।
স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবার বর্তমান চিত্র
সরকারি তথ্যমতে, ৯৫.৪ শতাংশ স্কুল এবং ৮৭.৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পানির উৎস রয়েছে। কিন্তু মানসম্মত ও নিয়মিত প্রাপ্যতার নিরিখে ‘বেসিক’ সেবা স্তর পরিমাপ করলে স্কুলে এই হার ৮৬.১ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাত্র ৭০.৫ শতাংশে নেমে আসে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর হ্রাস একটি নিয়মিত সংকট, যা সেবার কার্যকারিতাকে ব্যাহত করছে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মর্যাদা রক্ষার সংকট: দেশের মাত্র ২৮.৬ শতাংশ স্কুলে প্রতি ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি উন্নত টয়লেটের আদর্শ মান বজায় রয়েছে।
- মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার শোচনীয় অবস্থা: জাতীয়ভাবে মাত্র ৬.৯ শতাংশ স্কুলে মৌলিক এমএইচএম সেবা রয়েছে এবং পাঁচটি স্কুলের মধ্যে একটিতে মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যক্তিগত কক্ষের ব্যবস্থা আছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ভয়াবহ পরিস্থিতি
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবস্থা আরও উদ্বেগজনক। মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হাত ধোয়ার মৌলিক ব্যবস্থা রয়েছে। মহামারি পরবর্তী সময়ে সাবান-পানিহীন ক্লিনিকগুলো সংক্রমণের উৎস হতে পারে, যা নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার উপেক্ষা
উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। মাত্র ৫৫.৪ শতাংশ স্কুল এবং ৪০.৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব যাতায়াত ও ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। এটি ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ মূলনীতির পরিপন্থি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও টেকসই সমাধান
জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতও এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। গত ১২ মাসে ২৪ শতাংশ স্কুল এবং ১৯.৪ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তাদের ওয়াশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ৭৮.২ শতাংশ স্কুলে ওয়াশ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট বাজেট নেই।
- বাজেট বরাদ্দ জরুরি: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্য খাতে স্থানান্তর অযোগ্য নির্দিষ্ট বাজেট লাইন বরাদ্দ করতে হবে।
- প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো বাধ্যতামূলককরণ: বেসরকারি ও আধা-সরকারি স্কুলের এমপিওভুক্তির শর্ত হিসেবে প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেট ও র্যাম্প নিশ্চিত করতে হবে।
- জরুরি এমএইচএম কিট: প্রতিটি স্কুলে স্যানিটারি প্যাড, পরিষ্কার কাপড় ও সাবান সমৃদ্ধ কিট থাকা আবশ্যক, যা একজন নারী শিক্ষক তদারকি করবেন।
- জলবায়ু অভিযোজন: জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার (এনএপি) অংশ হিসেবে উপকূলীয় ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় লবণাক্ততা প্রতিরোধী পাইপিং ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
উপসংহার: অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবি
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন কেবল অবকাঠামোর বিষয় নয়, এটি মানুষের মর্যাদা ও বেঁচে থাকার অধিকারের সাথে জড়িত। সরকারের নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে এই অধিকার নিশ্চিত করার। বিবিএস-এর পরিসংখ্যানগুলো কেবল কাগুজে সংখ্যা নয়, বরং সেসব শিশু ও রোগীদের প্রতিচ্ছবি যারা প্রতিদিন অনিরাপদ স্যানিটেশনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচে। ২০৩০ সালের মধ্যে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে, কভারেজের মোহ ত্যাগ করে অধিকার ও ন্যায়বিচারের বাস্তবতায় পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। সরকারের উচিত নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যেন নিরাপদ ওয়াশ-সেবা প্রতিটি নাগরিকের অলঙ্ঘনীয় অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।



