হামের প্রাদুর্ভাবে উদ্বেগ: ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরা বেশি আক্রান্ত
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, গত ১৫ মার্চ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সারা দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সন্দেহজনকভাবে আরও ১৮১ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আক্রান্তের হার ও বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ
এ সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৪৪৩ জন। সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি, যা ২৩ হাজার ৬০৬ জনে দাঁড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শনাক্তকৃত রোগীদের মধ্যে ৩৪ থেকে ৬০ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় বলে তারা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন, শরীরে হার্ড ইমিউনিটি থ্রেশহোল্ড অর্জিত না হওয়ায় এই বয়সের শিশুরা হামের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। এছাড়া মায়েদের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে পর্যাপ্ত ইমিউনিটি ট্রান্সফার না হওয়া, অপুষ্টি এবং ভিটামিনের ঘাটতিও ৯ মাসের কম বয়সি শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
টিকা কর্মসূচির ব্যর্থতা ও সরকারি অব্যবস্থাপনা
সারা দেশে হামের এই দুর্যোগ নেমে আসার পেছনে বিগত দুটি সরকারসহ বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে হাম রোগটি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতের গাফিলতির কারণে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
চাহিদার অনুপাতে হামের টিকা মজুত না থাকা, মাঠ পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকট, জনবল ঘাটতি এবং টিকা কর্মসূচিতে নজরদারির অভাব এই সংকটকে তীব্র করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত কর্মীদের অসন্তোষ এবং নিয়মিত বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন না হওয়াও সমস্যাকে বাড়িয়েছে।
হামের রুটিন টিকা কার্যক্রমের ঘাটতি
হামের রুটিন টিকা কার্যক্রমে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা যায়নি। এই বাদ পড়া শিশুরা পাঁচ বছর অন্তর বিরাট সংখ্যায় পরিণত হয়েছে, যা হামের মহামারি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। ৯ মাসের কম বয়সি শিশুদের হাম সংক্রমিত হওয়ায় তাদের অভিভাবক ও স্বজনদের মধ্যেও ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, "কোনো রোগের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করলে তা জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়"। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল ও অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিস্থিতিকে জরুরি ঘোষণা করা হয়নি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, হাম দ্রুত ছড়ায় এবং টিকা দেওয়ার পর কার্যকারিতা পেতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। তিনি হাসপাতালের সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে সম্প্রসারণের ওপর জোর দেন।
তিনি আরও বলেন, "আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১০ জনে দাঁড়িয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি।"
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের আহ্বান
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো উপস্থাপন করেন:
- পুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’ কার্যক্রম জোরদার করা
- অপুষ্ট শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা প্রদান
- মাতৃদুগ্ধপান উৎসাহিত করা
- স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি
- হাম নির্মূল কৌশলপত্র পুনরুজ্জীবন
- টিকার সরবরাহ ও উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ
বর্তমান সরকার বিগত দুই সরকারের গাফিলতি ও অদূরদর্শী পরিকল্পনাকে দায়ী করলেও, স্বাস্থ্য খাতের ক্ষত সারাতে বর্তমান স্বাস্থ্য বিভাগের জোরালো উদ্যোগের অভাবও বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন। এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপের এখনই সময় বলে তারা মনে করছেন।



