হামের মহামারি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের দাবি চিকিৎসকদের
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত সাত মাস বয়সী আয়ানকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছেন তার বাবা মোহাম্মদ মনির। এই করুণ দৃশ্য দেশে হামের ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলছে। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে ‘হামে শিশুমৃত্যু: জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ) দেশে চলমান হামের পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতির সংজ্ঞা ও বর্তমান অবস্থা
সংবাদ সম্মেলনে ডিপিপিএইচ-এর সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা ব্যাখ্যা করেন, কোনো রোগের বিস্তার যখন সময়, স্থান ও আক্রান্ত ব্যক্তির বিবেচনায় অস্বাভাবিক হয়, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেটা সামাল দিতে পারে না, তখন সেটা জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের মতে, বর্তমানে হামের বিস্তার এ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাই সরকারের কাছে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ঘোষণার আহ্বান জানাচ্ছে সংগঠনটি।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
জনস্বার্থ বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘মহামারি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব কাজ করছে সরকার। চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল আর নিরবচ্ছিন্ন সেবার মতো উদ্যোগ নিয়েছে। বাড়তি চিকিৎসকও নিয়োগ দিচ্ছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।’ অন্যদিকে, আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন সতর্ক করে বলেন, হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয় এবং টিকা দেওয়ার পর দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে কার্যকারিতা পেতে। তিনি উল্লেখ করেন, আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিনজনের মৃত্যু হতো, কিন্তু এবার তা ১০ জনে পৌঁছেছে, যা উদ্বেগজনক।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক শিশু ও অতীতের উদ্যোগের অভাব
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক শিশুরা। শিশুবিশেষজ্ঞ কাজী রকিবুল ইসলাম যোগ করেন, অতীতে শুধু হামের টিকা দেওয়া হয়নি এমন নয়, হাম-পরবর্তী শিশুদের রাতকানাসহ যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলো প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ডিপিপিএইচ-এর দাবি ও সুপারিশসমূহ
ডিপিপিএইচ-এর সদস্যসচিব শাকিল আখতারের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি জরুরি উদ্যোগের দাবি জানানো হয়:
- অবিলম্বে সারা দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা।
- আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
- টিকা নিয়ে সমাজে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও গুজব মোকাবিলায় কার্যকর জনসচেতনতা কার্যক্রম চালু করা।
- শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা।
এছাড়াও, নীতিগত সুপারিশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়:
- পুষ্টি ও ভিটামিন-এ কার্যক্রম জোরদার করা এবং অপুষ্ট শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
- মাতৃদুগ্ধ পান ও পুষ্টি কর্মসূচি শক্তিশালী করা।
- স্বাস্থ্য সংস্কার বাস্তবায়ন ও বাজেট বাড়ানো।
- হাম নির্মূল কৌশলপত্র পুনরায় সক্রিয় করা এবং টিকার সরবরাহ শক্তিশালী করা।
- টিকা উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা।
- স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া।
- ছয়টি বিভাগে নির্মিত শিশু হাসপাতালগুলো দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা।
এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে হামের মহামারি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



