হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাসপাতাল থেকে আংশিক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার মাত্র কয়েক দিন পরই শিশুরা পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং আবারও হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছে। গত ২৭ দিনে হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেছে ১৪ হাজার ৫৬১ শিশু। তাদের মধ্যে ১৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ২৪১ জনের এবং মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। নিশ্চিত হাম শনাক্তের তুলনায় উপসর্গভিত্তিক আক্রান্ত পাঁচ গুণের বেশি এবং মৃত্যু প্রায় ছয় গুণ।
চিকিৎসকদের সতর্কতা: পূর্ণ সুস্থ না হতেই হাসপাতাল ত্যাগ বিপজ্জনক
চিকিৎসকদের মতে, পূর্ণ সুস্থ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ এবং পরবর্তী সময়ে সঠিক যত্নের অভাবেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতার মতো জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান বলেন, 'জ্বর কমলেই রোগীকে বাড়ি পাঠানো ঠিক নয়। শিশু পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়পত্র দেওয়া উচিত নয়।' তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, হামের সময় শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ফুসফুসে সংক্রমণ হয়ে নিউমোনিয়া হতে পারে। এছাড়া চোখের জটিলতা থেকে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। এজন্যই হামের রোগীদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল দেওয়া জরুরি।
আকিরার করুণ কাহিনী: বাবার বুকে শেষ আবদার
'পিআইসিইউতে মেয়েটা আমার অপেক্ষাতেই ছিল। অন্যদিকে ফিরে ছিল। হাত দুটো বাঁধা ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখে হাত দুটো যতটুকু উঁচু করা যায়, তা করে বলল, 'বাবা আমাকে বুকে নাও। আমাকে পানি দাও।' চিকিৎসক কাছে যেতে নিষেধ করলেন। মেয়েকে বুকে নিতে পারলাম না, পানি দিতে পারলাম না।' বাবা আল আমিনের কাছে তার ৪ বছর ৩ মাস বয়সি মেয়ে আকিরা হায়দার আরশির এটাই ছিল শেষ আবদার। বাবা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না, তার কলিজাটা আর নেই। ১ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে ডা. এম আর খান শিশু হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) বাবা-মেয়ের শেষ কথা হয়। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ২ এপ্রিল রাত ৮টার পর চিকিৎসকেরা আকিরাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আকিরার যে মৃত্যুসনদ দিয়েছে, তাতে রোগ বা মৃত্যুর কারণ হিসেবে হামের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, সারা শরীরে জীবাণু সংক্রমণ এবং হূদ্যন্ত্রের জন্মগত সম্ভাব্য ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসপাতালে করিডোরে চিকিৎসা: আরিয়ান ও রাফসানের অবস্থা
আল আমিন জানান, মিরপুরের এই হাসপাতাল ছাড়াও ডেলটা হাসপিটাল ও গ্লোবাল স্পেশালাইজড হাসপিটালে নিউমোনিয়া, হামসহ নানা জটিলতায় পাঁচ দফায় ২৭ দিন ভর্তি ছিল তার মেয়ে। রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপিটালে গিয়ে দেখা যায়, হাজারীবাগের বাসিন্দা খাদিজার সাত মাস বয়সি শিশু আরিয়ান হাসপিটালের করিডোরে একটি বেডে চিকিৎসাধীন। খাদিজা জানান, ঈদের দুই দিন আগে আরিয়ানের হাম ও নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তখন লক্ষণ মৃদু থাকায় তিন দিনের ওষুধ দিয়ে তাকে ছুটি দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ি ফেরার তিন দিন পরই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। বিভিন্ন হাসপিটাল ঘুরে বর্তমানে সে আবারও ঐ হাসপিটালে ভর্তি। অনবরত কাশি আর শ্বাসকষ্টে শিশুটি এখন এতটাই দুর্বল যে কিছুই খেতে পারছে না। ওয়ার্ডে বেড খালি না থাকায় করিডোরেই চলছে তার চিকিৎসা। একই চিত্র দেখা গেছে ডিএনসিসি হসপিটালে। সেখানে ১৭ মাস বয়সি শিশু রাফসান আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ঢাকা মেডিক্যাল ঘুরে এখানে ভর্তি হওয়া এই শিশুটি একবার সুস্থ হয়ে বাড়ি গেলেও ফের নিউমোনিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে।
পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর
ডা. এফ এ আসমা খান আরো জানান, হামের সময় মুখে ঘা হওয়ার কারণে শিশুরা খেতে পারে না, যা তাদের আরো দুর্বল করে দেয়। এই সময়ে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার যেমন—কলা, পেঁপে, গাজর, মাছ ও সবজি জাতীয় সুপ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী জানান, এক বার হাম হলে সাধারণত দ্বিতীয় বার হয় না। তবে হাম শরীরকে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে অন্য কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া সহজে আক্রমণ করতে পারে। অনেক সময় শরীরের র্যাশ বা লালচে দানা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে, তাই ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তিনি সুস্থ হওয়ার পর শিশুকে নিয়মিত রোদে নেওয়া এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭৭। এ সময় ১৬৮ জন নিশ্চিত হাম রোগী হাসপিটালে ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপিটালে ভর্তির সংখ্যা ৮ হাজার ৯১০। সন্দেহজনক হাম রোগীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপিটাল ত্যাগ করেছে ৬ হাজার ৬০৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৪৪ জন সন্দেহজনক হাম রোগী মৃত্যুবরণ করেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব তথ্য জানানো হয়।
চিকিৎসকদের মূল বার্তা: হামের পূর্ণ চিকিৎসা জরুরি
ডিএনসিসি হাসপিটালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসিফ হায়দার জানান, তাদের ৩০০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ২৮০ জন ভর্তি রয়েছে, যার মধ্যে ৩৭ জন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলছেন, শিশুদের অকাল মৃত্যু এবং দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব রোধে হামের পূর্ণ চিকিৎসা এবং হাসপিটাল থেকে ফেরার পর সঠিক পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এক মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুরা হামের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি। ১২ মাসের কম বয়সি শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, টিকা না নেওয়া ব্যক্তি এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে ১৯৯০ সালের পর টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসা ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। যারা আগে হামে আক্রান্ত হয়েছেন, তারাও প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির কারণে বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটি মহামারিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম।



