হামের আক্রমণে যমজ শিশু হাসানের মৃত্যু, হোসেনের চিকিৎসা আটকে অর্থকষ্টে
বরগুনার পাথরঘাটার যমজ শিশু হাসান ও হোসেন। তাদের বয়স মাত্র আট মাস। জন্মের সময়ই মা সুমাইয়ার মৃত্যু হয়, ফলে তারা বড় হয়েছে ফুফু ও নানির কাছে। কিন্তু দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে এই দুই শিশু। গত ২৭ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হাসান মারা গেছে, হামকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, পরিবারের আর্থিক দুর্দশার কারণে হোসেনের চিকিৎসা চলছে বাড়িতেই, হাসপাতালে ভর্তি করানো সম্ভব হচ্ছে না।
হাসানের মৃত্যু ও হোসেনের সংগ্রাম
হাসান ও হোসেনের বাবা দিনমজুর সোহেল রানা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, "হাসান–হোসেনের মা তাঁর ছেলেদের মুখ না দেখেই মারা গেছেন। ছেলেরাও মায়ের মুখ দেখেনি। অনেক চেষ্টা করেও আমি হাসানকে বাঁচাতে পারিনি। হোসেনকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারছি না। আল্লাহ যা কপালে রাখছে, তা–ই হইব।" হাসানের ফুফু মোসাম্মৎ নার্গিস জানান, প্রথমে হাসানের সর্দি ও জ্বর হয়, পরে বরগুনা, বরিশাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সাত দিন চিকিৎসার পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায় প্রায় ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
দেশে হামের ভয়াবহ পরিস্থিতি
এদিকে, সন্দেহজনক হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে হামে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে মোট ২১ শিশু মারা গেছে, আর সন্দেহজনক হাম নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১২৮ শিশুর। দুয়ে মিলে শিশুমৃত্যু দাঁড়িয়েছে ১৪৯টিতে। এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত মোট শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৩৯৮, আর সন্দেহজনক হাম নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৮৮৩। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়া পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৬৩৫।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ও টিকা সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ঢাকা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ২০২২ সালে ছিল ১ দশমিক ৪১, বর্তমানে তা বেড়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। সংক্রমণের মূল কারণ হিসেবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা যারা গত দুই বছরে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার ক্ষেত্রে গাফিলতি হয়েছে, বর্তমান সরকারও এ বিষয়ে আগের সরকারকে দায়ী করছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আগের সরকারের গাফিলতির কারণে হামের টিকার সংকট তৈরি হয়েছে।
হামের বিস্তার ও আর্থিক সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাম ছড়িয়েছে দেশের ৫৬ জেলায়। বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুসারে, বরগুনা সদরে হামের সংক্রমণের হার ২৯৪ দশমিক ৫, অর্থাৎ প্রতি ১০ লাখে সংক্রমণ ঘটেছে ২৯৪ দশমিক ৫ জনের। বরগুনার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ জানান, এ বছর জেলায় এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪০ জন, যার মধ্যে ৩৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, ৩ জন মারা গেছেন। হোসেনের বাবা সোহেল রানা বলেন, "টাকাপয়সার সংকট চলছে। জায়গাজমিও নাই যে তা বেইচ্যা ছেলের চিকিৎসা করব।" তিনি একটি ইটভাটায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন, দৈনিক মজুরি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, কিন্তু ছেলেদের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না। স্ত্রীর চিকিৎসায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, সেই ঋণও শোধ করতে পারেননি, এখন হাসানের চিকিৎসার জন্য আবার ধারদেনা করতে হয়েছে।



