প্রাণী স্বাস্থ্যে বিপ্লব: বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টিকাকার্ড চালুর প্রস্তাব
প্রাণীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কৃষকদের জীবিকা সুরক্ষা এবং পশুপাখি থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রাণীর জন্য টিকাকার্ড চালুর যুগান্তকারী প্রস্তাব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর হোটেল বেঙ্গল ব্লুবেরিতে আইসিডিডিআর,বি এবং প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘প্রাণীর টিকাকার্ড উন্নয়ন পর্যালোচনা কর্মসূচি’ থেকে এ অভিনব প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬-এর ‘Together for Health: Stand with Science’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় টিকা উৎপাদনে বড় ঘাটতি
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের (প্রশাসন) পরিচালক ডা. মো. বয়জার রহমান অনুষ্ঠানে বলেন, “প্রাণীর জন্য আমাদের জাতীয় টিকা উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ। টিকাদান ব্যবস্থা শক্তিশালী না করলে প্রাণিসম্পদ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না।” ওয়ান হেলথ প্রতিষ্ঠাতা ডা. মাহমুদুর রহমান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “হাম ও বার্ড ফ্লুর মতো সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে, টিকাদানে ঘাটতি থাকলে মানুষ ও প্রাণী উভয়ের স্বাস্থ্যই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।”
টিকাকার্ড কীভাবে কাজ করবে?
আইসিডিডিআর,বির ওয়ান হেলথ রিসার্চ ইউনিটের বিজ্ঞানী ও টিম লিডার ডা. সুকান্ত চৌধুরী ব্যাখ্যা করেন, “এই উদ্যোগের মাধ্যমে নির্দেশিকা ও টিকাকার্ড চালু করা হচ্ছে, যা কৃষকদের টিকাদান ট্র্যাক করতে, কভারেজ বাড়াতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করতে সহায়তা করবে। এতে প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে এবং প্রাণিসম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই উপকারী হবে।” প্রস্তাবিত টিকাকার্ডে প্রাণীর পরিচিতি, টিকাদানের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের সময়সূচী সংরক্ষণ করা হবে, যা টিকাদান কার্যক্রমের নজরদারি ও সমন্বয়কে আরও কার্যকর করে তুলবে।
প্রাণিসম্পদ খাতের বর্তমান চিত্র
অনুষ্ঠান থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাত জাতীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:
- এই খাত জিডিপিতে প্রায় ১.৮১ শতাংশ অবদান রাখে।
- লাখো মানুষের জীবিকার সাথে সরাসরি যুক্ত এই খাত।
- প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি প্রাণিসম্পদ খাতে সম্পৃক্ত।
কিন্তু এর বিপরীতে টিকাদানের হার অত্যন্ত কম। গ্রামীণ কৃষকদের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ নিয়মিতভাবে তাদের প্রাণীদের টিকা দিয়ে থাকেন। মানুষের জন্য সফল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও প্রাণীর জন্য সমন্বিত জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি।
টিকাদানে প্রধান বাধাসমূহ
বিশেষজ্ঞরা টিকাদান কার্যক্রমে নিম্নলিখিত প্রধান বাধাগুলো চিহ্নিত করেছেন:
- সচেতনতার অভাব ও টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ
- দুর্বল শীতলীকরণ ব্যবস্থাপনা ও টিকার অনিয়মিত সরবরাহ
- প্রশিক্ষিত ভেটেরিনারি জনবলের মারাত্মক ঘাটতি
- টিকাদান, শনাক্তকরণ এবং রেকর্ড সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা
- কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের অভাব
বাংলাদেশ: জুনোটিক রোগের বৈশ্বিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল
বাংলাদেশ উদীয়মান সংক্রামক রোগের একটি বৈশ্বিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত, যার প্রায় ৭০ শতাংশই জুনোটিক বা প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমণযোগ্য। উচ্চ জনসংখ্যা ঘনত্ব, মানুষ ও প্রাণীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, জীবন্ত পশুপাখির বাজার এবং দ্রুত নগরায়ন সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অ্যানথ্রাক্স, রেবিস এবং বার্ড ফ্লুর পুনরাবৃত্ত প্রাদুর্ভাব এই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলছে।
টিকাকার্ডের প্রত্যাশিত সুফল
এই যুগান্তকারী উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্নলিখিত সুফলগুলো প্রত্যাশিত:
- টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে
- নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার হবে এবং প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার কার্যকারিতা বাড়বে
- প্রাণীর মৃত্যুহার কমবে ও চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস পাবে
- উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত হবে
- রোগের বোঝা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমবে
- কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে
- জুনোটিক রোগের সংক্রমণ হ্রাস পাবে
- অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় সহায়তা করবে
সমন্বিত অঙ্গীকার
গোলটেবিল আলোচনার শেষে অংশগ্রহণকারীরা সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক প্রাণী টিকাদান ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মিলিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। আইসিডিডিআর,বি ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তৈরি করা কাঠামোবদ্ধ টিকাদান ব্যবস্থার প্রস্তাবনায় গবাদিপশু, পোল্ট্রি ও পোষা প্রাণীর জন্য টিকাকার্ড চালুর রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।



