হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি: ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি

হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব আবারও ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। শিশুদের জন্য অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগের বিস্তার শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং একটি বড় মানবিক উদ্বেগ হিসেবেও সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে জরুরি ভিত্তিতে ১২ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার সরকারি ঘোষণা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

টিকাদান কর্মসূচির বিস্তারিত পরিকল্পনা

জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।

কর্মসূচির প্রথম দিনেই ৭৬ হাজার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭৩ হাজার শিশুকে টিকা প্রদান করা হয়েছে, যা প্রায় ৯৬ শতাংশ সাফল্যের ইঙ্গিত দেয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সূচনা, যা সঠিকভাবে অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাম রোগের প্রকৃতি ও পূর্ববর্তী সাফল্য

হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ির মতো সাধারণ উপসর্গ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের জটিলতায় রূপ নিতে পারে। ফলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে টিকাদানের বিকল্প নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশ অতীতে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সমালোচনা করে উল্লেখ করেছেন যে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর দেশে বড় কোনো বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়নি।

ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ধাপে ধাপে টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আগামী ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু হবে এবং ৩ মে থেকে সারা দেশে বাকি এলাকাগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম চালু করা হবে। পাশাপাশি শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কার্যক্রমও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা

চিকিৎসা ব্যবস্থার দিক থেকেও কিছু প্রস্তুতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে এবং রাজশাহী অঞ্চলে নতুন করে ২৫০টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হচ্ছে। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইসিডিডিআরবি’র উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী অক্সিজেন প্রবাহ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ইউনিসেফ থেকে অতিরিক্ত টিকা সংগ্রহের জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক থেকেও ঋণ ও অনুদানের আশ্বাস পাওয়া গেছে। এই আন্তর্জাতিক সহায়তা টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

এই আশাব্যঞ্জক ঘোষণার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগও সামনে এসেছে। সংসদ সদস্য আখতার হোসেন অভিযোগ করেছেন যে গত তিন সপ্তাহে সন্দেহজনক হামে ১১৫ জনেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নিশ্চিতভাবে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কাগজে-কলমে বরাদ্দ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন বা আইসিইউ সুবিধা পাচ্ছে না।

স্বাস্থ্যখাতের বাজেটের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেছেন। এই অভিযোগগুলো একেবারেই অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। বরং এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ নীতিগত ঘোষণা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা।

সরকারের প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে টিকার কোনো ঘাটতি যেন না হয়, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা।

সবশেষে বলা যায়, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকারের এই জরুরি উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপর। টিকাদান কর্মসূচি শুধু একটি স্বাস্থ্য উদ্যোগ নয়, এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা মানে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। তাই রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিতভাবে কাজ করাই এখন সময়ের দাবি।