বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে সতর্কতা: ভ্রান্ত তথ্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় হুমকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে সতর্কতা: ভ্রান্ত তথ্য বড় হুমকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে সতর্কতা: ভ্রান্ত তথ্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য বড় হুমকি

আজ ৭ এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। প্রতিবছরের মতো এ বছরও সারাবিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ'। দিবসটি উপলক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

ভ্রান্ত তথ্যের ছড়াছড়ি: স্বাস্থ্যখাতের চ্যালেঞ্জিং সময়

তবে এ বছর দিবসটি এমন এক সময়ে পালিত হচ্ছে, যখন নানা ধরনের ভ্রান্ত তথ্য আর গুজবের ছড়াছড়িতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভ্রান্ত তথ্য বা মিসইনফরমেশন দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য অন্যতম বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিয়ে গুজব থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক টাইফয়েড ও হাম টিকাদান কর্মসূচি ঘিরে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলছে, আস্থা কমাচ্ছে এবং জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: ডিসইনফরমেশনের বিপদ

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ বলেন, "মহামারির সময় দেখা গেছে কীভাবে ভ্রান্ত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও ঘটতে দেখা গেছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, মিসইনফরমেশন অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ালেও ‘ডিসইনফরমেশন’ অর্থাৎ জেনেশুনে ভুল তথ্য ছড়ানো আরও বেশি বিপজ্জনক। এ ধরনের অপতথ্য টিকা গ্রহণ ও চিকিৎসা সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া জাতীয় টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচির সময় অনলাইনে ও অফলাইনে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই টিকা মেয়েদের বন্ধ্যাত্ব ঘটায়, ছেলেদের পৌরুষ কমিয়ে দেয়, এমন নানা গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ।

টিকাদান বিশেষজ্ঞের বক্তব্য: নেতিবাচক প্রচারণার ইতিহাস

টিকাদান বিশেষজ্ঞ তাজুল কাদেরি বলেন, "বাংলাদেশে টিকা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা নতুন নয়। টাইফয়েড টিকা চালুর সময় এটিকে ‘ভারতীয়’ ও ‘হারাম’ বলে প্রচার চালানো হয়েছিল, যা অনেককে নিরুৎসাহিত করেছে।" তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সব টিকাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হলেও ডব্লিউএইচওর অনুমোদন ছাড়া কোনও টিকা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ভিত্তিহীন দাবি শুধু বিভ্রান্তিকর নয়, বিপজ্জনকও—কারণ এগুলো প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগকে দুর্বল করে।

পশ্চিমা দেশগুলোর উদাহরণ ও বাংলাদেশের অবস্থান

তাজুল কাদেরি আরও বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোতে টিকাবিরোধী প্রচারণা আরও শক্তিশালী। বিশ্বজুড়ে একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-ভ্যাকসিন লবি রয়েছে। রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে টিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে টিকাদানের হার ঐতিহাসিকভাবে বেশি থাকলেও সামান্য পতনও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের মধ্যে হাম নির্মূলের সনদ পাওয়ার পথে ছিল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে হামমুক্ত দেশ হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু ভ্রান্ত তথ্য টিকাদানে প্রভাব ফেললে এই অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভরতা ও টিকায় অনীহা

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রশংসিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি মৌলিক টিকার আওতা ৯৭ শতাংশের বেশি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কভারেজ ৫-১০ শতাংশ কমলেও হামসহ প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব আবার বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের জন্য ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করেন। ফলে বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কোভিড-১৯-এর সময় যেমন টিকা গ্রহণে প্রভাব পড়েছিল, এখন টাইফয়েড ও হাম নিয়েও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেক পোস্টে টিকাকে ‘বিষ’, ‘কালো জাদুর অংশ’ বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থার তথ্য: টিকাবিরোধী পোস্টের বিস্তার

ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ডিসমিসল্যাব জানায়, অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই একই ধরনের ডজনখানেক টিকাবিরোধী পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে অভিভাবকদের টিকা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ভ্রান্ত তথ্যের প্রভাব: হাম ও টাইফয়েড টিকা নিয়ে উদ্বেগ

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে সন্দেহজনক হাম রোগে ১১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ হাম রোগীই পূর্ণ ডোজের টিকাপ্রাপ্ত নয়। টিকা না নেওয়া বড় শিশুরা বাহক হিসেবে কাজ করে ছোট শিশুদের সংক্রমিত করছে।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হাম রোগীদের প্রায় ৫৯ শতাংশের বয়স ০-৯ মাস, যারা এখনও প্রথম ডোজ নেওয়ার মতো বয়সে পৌঁছায়নি। এদিকে ডব্লিউএইচও অনুমোদিত টাইফিবেভ টাইফয়েড টিকাকে ঘিরেও অনলাইনে সমন্বিত ভ্রান্ত প্রচারণা চালানো হয়েছে—যেখানে বলা হয়েছে এতে জীবিত ব্যাকটেরিয়া রয়েছে বা অজানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে।

আস্থার সংকট ও ভ্রান্ত তথ্যের চরম মূল্য

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে আস্থার ঘাটতিও ভ্রান্ত তথ্য বিস্তারের একটি বড় কারণ। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি জনগণকে নিজ খরচে বহন করতে হয়। ফলে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনির্ভরযোগ্য উৎসের পরামর্শের ওপর নির্ভর করেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেন, ভ্রান্ত তথ্য শুধু মানুষকে বিভ্রান্তই করে না, এটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। তাদের মতে, জনস্বাস্থ্যের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘আস্থা’; একবার তা নষ্ট হলে পুরো টিকাদান কর্মসূচি হুমকির মুখে পড়ে।

বিজ্ঞান নির্ভরতায় করণীয়: বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে বিশেষজ্ঞরা বহুমুখী পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রচার বাড়ানো, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, অনলাইনে ভ্রান্ত তথ্য শনাক্ত ও প্রতিরোধ, এবং জনস্বাস্থ্য শিক্ষায় বিনিয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং প্রাণঘাতী হতে পারে; নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, কেবল সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া যায়। প্রতি হাজার সংক্রমণে ১ থেকে ৩ জন শিশুর মৃত্যু হতে পারে। তবে টিকাদানের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে লাখো প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।

ইপিআই-এর সাবেক এক পরিচালক বলেন, হামের টিকা ১০০টিরও বেশি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি পরীক্ষামূলক নয়, বরং জীবনরক্ষাকারী একটি প্রমাণিত পদ্ধতি। তিনি বলেন, টিকার বিরুদ্ধে অপপ্রচার আছে, কিন্তু এর পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও রয়েছে। চ্যালেঞ্জ হলো—সেই প্রমাণকে মানুষের কাছে দৃশ্যমান, বোধগম্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন এক সময়ে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আর বিলাসিতা নয়—বরং অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখতে এটি অপরিহার্য।