শিশু টিকা সংকট: এক বছর আগের সতর্কবাণী আজ বাস্তব, হামে মৃত্যু ও হাসপাতালে শিশু ভর্তি
যাদের উদ্দেশ্য করে সাধারণত সম্পাদকীয় লেখা হয়, তারা কি কখনো তা পড়ে দেখেন? সম্ভবত তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের ক্ষেত্রে এর উত্তর নেতিবাচক হবে। যদিও বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেই সম্পাদকীয় কলামে প্রকাশিত বক্তব্য সেই দেশগুলোর নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, তার কারণও এর মধ্যে নিহিত; কিন্তু দুঃখজনকভাবে তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে সংবাদপত্রের মতামত বা সম্পাদকীয়কে তুচ্ছ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র হিসেবে ইত্তেফাক এই ধরনের বহু ঘটনার সাক্ষী।
হামে আক্রান্ত হয়ে ১৩০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে সহস্রাধিক শিশু
হামে আক্রান্ত হয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সহস্রাধিক শিশু। দুঃখের সাথে বলতে হয়—গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১০ মার্চ আমাদের এই সম্পাদকীয়তে ‘শিশুদের টিকা সংকটের বিপদ অনেক’ শিরোনামে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল—‘শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা মানবসভ্যতার অন্যতম মৌলিক চাহিদা। বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। একসময় নানা প্রাণঘাতী রোগে শিশু মৃত্যুহার ছিল উদ্বেগজনক। সরকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ৩০টি জেলায় টিকা সংকটের যেই চিত্র ফুটে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক।
টিকা সংকটের কারণ ও প্রভাব
১৯৭৯ সালে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চালু হওয়ার পর থেকে দেশে শিশুদের জীবনরক্ষা কার্যক্রম এক অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বলে থাকেন, টিকাদান কার্যক্রমের পূর্বে প্রতি বছর প্রায় ২৫ লক্ষ শিশু ছয়টি প্রধান সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করত; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, টিকার সংকট চলমান থাকলে এই অর্জন বিপন্ন হতে পারে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, টিকার সংকট হওয়ার কারণ নেই, বরং সরবরাহ কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, অনেক জেলায় গত জানুয়ারি মাস থেকে টিকার ঘাটতি চলছে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, যশোর, ঝিনাইদহসহ ৩০টির বেশি জেলায় পিসিভি, আইপিভি, পেন্টাভ্যালেন্ট, এমআরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিকার ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। অনেক অভিভাবক বারবার টিকাকেন্দ্রে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, ফলে শিশুদের নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
টিকা সংকটের তিনটি প্রধান কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার সংকটের তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, সরকারি অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে, যার ফলে টিকা ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, টিকা পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন ও লোকবলের অভাব রয়েছে, যার ফলে সময়মতো টিকা বিতরণ সম্ভব হচ্ছে না। তৃতীয়ত, গ্যাভি এবং কোভ্যাক্সের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের সহযোগিতায় টিকার সরবরাহ কমে গেছে, ফলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সংখ্যক টিকা সংগ্রহ করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা বা অনিয়মিততা অনেক সংক্রামক রোগের পুনরুত্থানের কারণ হতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা দেখায় যে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে টিকা প্রদানে ব্যত্যয় ঘটলে সেখানে নানা রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। চট্টগ্রামে পূর্বে হামের টিকা যথাসময়ে না দেওয়ায় শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
অতএব, বাংলাদেশে টিকা সংকট চলতে থাকলে সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান ঘটতে পারে, যা শুধু শিশুদের জন্য নয়, বরং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি। ইপিআই কর্মসূচি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এক গৌরবময় সাফল্য, এটি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। যেহেতু শিশুরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, তাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা জাতির নৈতিক দায়িত্ব। এক বছর পূর্বের এই কথাগুলি এখন প্রকটভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বস্তুত, সরকারের নীতিনির্ধারণে যারা থাকেন, তারা সকলেই জানেন। তার পরও শিশুদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলার ঝুঁকি যারা গ্রহণ করেন, তাদের হৃদয় কী দিয়ে তৈরি, কতটা দায়িত্বশীল—আমরা জানি না।



