হামের প্রাদুর্ভাবে উদ্বিগ্ন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ৫৬ জেলায় ছড়িয়েছে সংক্রমণ
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থার ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৬টি জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং আক্রান্তদের মধ্যে ৬৯ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষ করে, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার ৩৪ শতাংশ, যা কনিষ্ঠতম জনগোষ্ঠীর উচ্চ সংবেদনশীলতা নির্দেশ করে।
টিকাদানে ঘাটতি প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদানে সৃষ্ট ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতিই এই প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক কারণ। কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে বাধার ফলে অনেক শিশু হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হামের সংক্রমণ প্রতি ১০ লাখে ১–এর নিচে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, বর্তমানে তা হঠাৎ করে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে।
৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১৯০ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিনিধির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগের কিছু এলাকা।
২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চ্যালেঞ্জ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এন্ডেমিক হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতি উদ্বেগজনক। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেছেন, “শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে উপযুক্ত জনবলের ঘাটতি আছে। জনবলঘাটতি দূর করতে হবে, ঠিক মানুষকে ঠিক জায়গায় বসাতে হবে। আর কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে উদ্দেশ্য সফল হবে না।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ
হামের দেশব্যাপী বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ সরকারকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর পরামর্শ দিয়েছে:
- ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য সারা দেশে দ্রুত উচ্চমানের হাম ও রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন বাস্তবায়ন করা।
- নজরদারি জোরদার করা, দ্রুত অবহিতকরণ এবং পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা।
- উপযুক্ত ক্লিনিক্যাল সেবার সঙ্গে ভিটামিন এ দেওয়াসহ রোগী ব্যবস্থাপনা জোরদার করা।
- সঠিক তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো।
- নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে দক্ষতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সাড়াদান কার্যক্রমের গতি ও গুণগত মানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদি রোগী শনাক্তকরণ ও অনুসন্ধানপ্রক্রিয়া শক্তিশালী করা যায় এবং আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত উচ্চ হারে টিকাদান করা যায়, তবে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। অন্যথায়, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি বজায় থাকলে আরও রোগী বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।



