হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সঠিক তথ্য ও আইনি পদক্ষেপের জরুরি তাগিদ
হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয় শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা সঠিক তথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বিএনপির অঙ্গসংগঠন ‘নিপীড়িত নারী ও শিশু আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে এ বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকে শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, টিকাবিশেষজ্ঞ, চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ অংশ নেন।
তথ্যের ঘাটতি ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে সতর্কতা
বক্তারা উল্লেখ করেন, হাম বিষয়ে সঠিক তথ্যের ঘাটতির কারণে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ তথ্য ছাড়া কোনো উদ্যোগ বা পরিকল্পনা সফল হতে পারে না। সঠিক তথ্য টিকার সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তারা। গণমাধ্যমসহ আগ্রহী সব পক্ষ যেন হাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য পায়, সে ব্যাপারে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।
নিউজ ব্রডকাস্টারস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সাকলায়েন রাসেল বলেন, ‘কোভিড মহামারির সময়ে যেমন তথ্যের অপব্যবহার হয়েছিল, হামের প্রাদুর্ভাবের সময়ও তেমনই দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকার ব্যাপারে ব্যাপকভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা প্রতিরোধ করা জরুরি।’ প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক যোগ করেন, ‘অপপ্রচার ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার আহ্বান
শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘মা–বাবা বা অভিভাবকদের হামে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে এবং বয়স অনুযায়ী ভিটামিন এ খাওয়াতে হবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, আক্রান্ত শিশুদের জন্য অক্সিজেনের নিশ্চয়তা বাড়ানো দরকার, এবং আইসিডিডিআরবি প্রবর্তিত সাশ্রয়ী অক্সিজেন–ব্যবস্থা সরকার বিবেচনা করতে পারে।
শিশু কিডনির রোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ প্রতিটি হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড খোলার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার ব্যবস্থা উপজেলা পর্যায়ে না হলে মানুষ রোগী নিয়ে ঢাকায় আসবে, যা পরিস্থিতি জটিল করতে পারে।’ রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা তথ্যের ঘাটতির কারণে টার্গেটেড ইন্টারভেনশন করা কঠিন হওয়ার কথা তুলে ধরেন।
টিকা কার্যক্রম ও আইনি দায়বদ্ধতার তাগিদ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের টিকা ও প্রতিরোধ রোগবিষয়ক ন্যাশনাল প্রফেশনাল কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান টিকা নেওয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিধা কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘টিকা কার্যক্রম জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমিনেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হায়দার তালুকদার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকার ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। তারা দাবি করেন, ‘দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে উদাহরণ সৃষ্টি করা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি না ঘটে।’ তারা হামে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনারও তাগিদ দেন।
অন্যান্য বক্তাদের মতামত
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল সুমন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম, ওজিএসবির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ফিরোজা বেগম, বাংলা ভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক আতিয়ার রহমান।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা হাম নিয়ে আরও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার উপর জোর দেন। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, সঠিক তথ্য, কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।



