ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে ৩৭৩ দুর্ঘটনায় ২৯৮ নিহত, চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ প্রাণহানি
ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে ৩৭৩ দুর্ঘটনায় ২৯৮ নিহত

ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে ৩৭৩ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জনের প্রাণহানি

এবারের পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে মোট ১৫ দিনে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত এই সময়কালে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৪৬ জন নারী এবং ৬৭টি শিশু রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হলেও উদ্বেগজনক অবস্থাই নির্দেশ করে।

চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বোচ্চ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। এই বিভাগে মোট দুর্ঘটনার ২৪.৯৩ শতাংশ এবং প্রাণহানির ২৪.৮৩ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। এরপরই রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে ১৭.৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা এবং ২৪.১৬ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে। অন্যান্য বিভাগগুলোর তুলনায় এই দুই বিভাগে ঈদযাত্রার সময় সড়ক নিরাপত্তার অবস্থা বিশেষভাবে নাজুক ছিল বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন যানবাহনে নিহতদের পরিসংখ্যান

দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ১১৬ জন, বাসযাত্রী ৪১ জন, ট্রাক-পিকআপ আরোহী ১৩ জন, প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস আরোহী ২০ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৫০ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নছিমন-ভটভটি-মাহিন্দ্র-টমটম) ৯ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ২ জন রয়েছেন। এছাড়া, মোট আহতের সংখ্যা ২ হাজারের বেশি, যা সড়ক নিরাপত্তার গুরুতর সংকটকে তুলে ধরে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুর্ঘটনার স্থান ও সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১১৫টি (৩০.৮৩%) জাতীয় মহাসড়কে, ১৬১টি (৪৩.১৬%) আঞ্চলিক সড়কে, ৪৮টি (১২.৮৬%) গ্রামীণ সড়কে, ৪২টি (১১.২৬%) শহরের সড়কে এবং ৭টি (১.৮৭%) ফেরিঘাটসহ অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে। সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬.১৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ভোরবেলা, ২৪.৩৯ শতাংশ সকালে, ২৩.০৫ শতাংশ দুপুরে, ১৭.৯৬ শতাংশ বিকেলে, ৮.০৪ শতাংশ সন্ধ্যায় এবং ২০.৩৭ শতাংশ রাতে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার পেছনে ১০টি প্রধান কারণ

প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে ১০টি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো:

  • ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন
  • বেপরোয়া গতি
  • চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা
  • বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা
  • মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল
  • তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো
  • জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও না মানার প্রবণতা
  • দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
  • বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সক্ষমতার ঘাটতি
  • গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি

নিরাপদ ঈদযাত্রার জন্য সুপারিশসমূহ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন একটি সুস্থ-স্বাভাবিক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে তিন বছর মেয়াদি একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

প্রতিবেদনে মোট ১২টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  1. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনর্গঠন এবং এর অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ পরিচালনা করা।
  2. বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
  3. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
  4. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করা।
  5. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা।
  6. বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবহনসেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো।

এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে পরবর্তী সব ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে বলে প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।