মশাবাহিত রোগের ভয়াবহতা: জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
দেশে মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা ও চিকুনগুনিয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ভবিষ্যতে নতুন নতুন প্রজাতির মশা ও অজানা রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে।
ম্যালেরিয়ার পুনরুত্থান: রাঙামাটির করুণ ঘটনা
দীর্ঘ ৯ বছর পর রাঙামাটি জেলায় ম্যালেরিয়ায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ১০ বছর বয়সী সুদীপ্তা চাকমা এক সপ্তাহ ধরে তীব্র জ্বরে ভোগার পর গত বছরের জুলাই মাসে মারা যান। শুধু সুদীপ্তাই নন, গত বছর এই জেলায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে মশাবাহিত এই রোগে। জেলা স্বাস্থ্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলো নতুন করে ভীতি সৃষ্টি করেছে।
২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই রোগ মূলত পার্বত্য অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। যদিও সামগ্রিক প্রকোপ কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে, কিন্তু নির্মূলের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। বরং কোনো কোনো এলাকায় রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।
ডেঙ্গু: সারা বছরের স্থায়ী ব্যাধি
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানী বা বড় শহরের সমস্যা নয়; এটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৬৮ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ডেঙ্গু এখন সারা বছরের অসুখে পরিণত হয়ে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুতে যত মৃত্যু হয়েছে, তার ২৫ শতাংশের বেশি ঘটেছিল শুধু বাংলাদেশে। এই উচ্চ মৃত্যুহার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরছে।
জিকা ও চিকুনগুনিয়ার উদ্বেগ
এডিস মশাবাহিত জিকা ভাইরাস বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৪ সালে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আইসিডিডিআরবির হিসাবে ১০ থেকে ১২ জন জিকা রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা বাস্তবে আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জিকা ভাইরাস অনাগত শিশুর মাইক্রোসেফালি তৈরি করতে পারে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
পাশাপাশি, ২০১৭ সালে চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পর এই রোগ এখনো জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। ২০২৫ সালে চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৬৮৩ জন চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টিটু মিঞা বলেন, চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আগের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
মশার বংশবৃদ্ধির সঙ্গে তাপমাত্রার পরিবর্তনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ুর পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমানের গবেষণায় দেখা গেছে, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল প্রতি বছর ০.০১৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতকাল আগের চেয়ে উষ্ণ হচ্ছে, যা মশার বংশবিস্তারের মৌসুমকে দীর্ঘায়িত করছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মশার প্রজননের জন্য ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ। বাংলাদেশের বর্তমান গড় তাপমাত্রা (২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মশা ও পরজীবী উভয়ের জন্যই অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও দীর্ঘ সময় ধরে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও অর্থনৈতিক চাপ
মশাবাহিত রোগগুলো কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এগুলো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতিটি পরিবারের মাথাপিছু গড় ব্যয় ছিল ১৯ হাজার টাকার বেশি। ২০২৩ সালে দেশের মানুষের পকেট থেকে কেবল ডেঙ্গুর পেছনেই ৫০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে।
অনেক পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে ঋণগ্রস্ত হয়েছে বা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে নামমাত্র খরচে কিছু সেবা পাওয়া গেলেও চিকিৎসার সিংহভাগ ব্যয়ভার রোগীর পরিবারকেই বহন করতে হয়।
মশা প্রতিরোধ পণ্যের বাজার বৃদ্ধি
মশাবাহিত রোগের আতঙ্ককে পুঁজি করে দেশে মশা নিধন সামগ্রীর বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। দিল্লিভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিক্সডব্লিউরিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মশা প্রতিরোধক পণ্যের বাজারে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৭.৫ শতাংশ।
এই খাতের বাজার বর্তমানে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কয়েলের আধিপত্য থাকলেও মানুষ এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে প্রাকৃতিক বা জৈব উপাদানভিত্তিক রিপেলেন্ট, ক্রিম এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
নতুন রোগের আশঙ্কা
দেশে বর্তমানে কিউলেক্স মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। এই মশার কামড়ে ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিসের মতো রোগ হতে পারে। আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশার বংশবিস্তার যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে বাংলাদেশে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস প্রবেশের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুও হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মশাবাহিত রোগগুলো আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।
এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমানের নগর ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ সমস্যার দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।



