হামের প্রাদুর্ভাবে ৪১ শিশুর মৃত্যু: টিকা সংকট নাকি অন্য কারণ?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই মৃত্যুর পেছনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া একটি সিদ্ধান্তকে অন্যতম দায়ী করা হচ্ছে। তবে সেই সরকারের স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এই অভিযোগের সাথে একমত নন।
টিকা সংকটের অভিযোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতে থাকা অপারেশন প্ল্যান বাতিল করায় পর্যাপ্ত টিকা আনা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, ‘টিকা সংকটের কথা আমি বলব না, তবে আমাদের হাতে পর্যাপ্ত টিকা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর্যাপ্ত টিকা না আসায় এই পরিস্থিতি হয়েছে।’
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ায় মজুত শূন্যে নেমে এসেছে।
সাবেক সরকারের প্রতিক্রিয়া
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সাইদুর রহমান বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো শিশুর অভিভাবক কি অভিযোগ করেছেন, তারা টিকা দিতে গিয়ে পাননি? অন্তর্বর্তী সরকার অনুদান নিয়ে টিকা কেনার পদ্ধতি বাতিল করলেও নিজস্ব অর্থায়নে টিকার ব্যবস্থা করেছে। দুই দফায় আমরা যে টিকা এনেছি, তাতে এখনও পর্যাপ্ত টিকা থাকার কথা।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমরা পরিকল্পনা কমিশনের সুনির্দিষ্ট সুপারিশের ভিত্তিতে অপারেশন প্ল্যান বাতিল করেছি। সরকার তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, অনুদান নিয়ে আর টিকা কেনা হবে না; নিজস্ব অর্থায়নে টিকা কেনা হবে।’
টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় জটিলতা
টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘গ্যাভি’ বাংলাদেশকে টিকা কেনায় আর্থিক সহায়তা দেয়। অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করা হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এই ব্যবস্থা বাতিল করে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এরপর থেকে নতুন প্রকল্প, দলিল তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়সহ সবকিছুতে বিলম্ব হওয়ায় এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহে নেই বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন।
হামের টিকা ও ক্যাম্পেইন
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘গত আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি। প্রতি চার বছর পরপর নিয়মিত টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়। এই ৮ বছরে ক্যাম্পেইনটা হয়নি, যে কারণে অনেক অভিভাবক না জানতে পেরে শিশুদের টিকা দেননি।’
তবে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেছেন, ‘তথ্যে কিছু বিভ্রান্তি আছে। আসলে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সর্বশেষ হামের টিকা দেওয়া হয়েছে ২০২০ সালে। চার বছর পর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে আবার ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই বছর এমন পরিস্থিতি ছিল না, ফলে দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আর কেন্দ্রীয় ভান্ডারে কমে গেছে বলে যে শেষ হয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। এই টিকাগুলো কেন্দ্রীয় ভান্ডারের বাইরেও বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে থাকে। সেইসব জায়গায় কিন্তু পর্যাপ্ত টিকা আছে।’
বিতর্কের মূল বিষয়
এই বিতর্কে কয়েকটি মূল বিষয় উঠে এসেছে:
- টিকা সংকটের সত্যতা
- অভিভাবকদের টিকা দেওয়ার অনীহা
- সরকারি টিকাদান ক্যাম্পেইনের ব্যর্থতা
- প্রশাসনিক জটিলতা ও বিলম্ব
অধ্যাপক সাইদুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘হামের টিকা একটি শিশু প্রথম ডোজ পায় ৯ মাস বয়সে, আর দ্বিতীয় ডোজ পায় ১৫ মাস বয়সে। কিন্তু যে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে বা আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের অধিকাংশের বয়স ৯ মাসের কম। তাহলে এই অভিযোগ আসছে কেন?’
এই পরিস্থিতিতে শিশু মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।



