দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি: শিশু মৃত্যু ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সংকট
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় এক মানবিক বিপর্যয়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বললে অত্যুক্তি হবে না যে, যেভাবে শিশুরা মারা যাচ্ছে, তা কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গভীর ক্ষতেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থেকে শুরু করে রাজশাহী ও ময়মনসিংহের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলিতে হামের কারণে শিশুদের মৃত্যুমিছিল ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
শিশু মৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, চলতি মাসেই হামে আক্রান্ত হয়ে ৪১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মহাখালী হাসপাতালেই প্রাণ হারিয়েছে ২২টি শিশু। অত্যন্ত সংক্রামক এই ব্যাধির এমন বিস্তার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে অভাবনীয় ও অত্যন্ত পীড়াদায়ক। উল্লেখ্য, হাম কোভিডের তুলনায় অধিক ছোঁয়াচে একটি ব্যাধি। ইহাতে আক্রান্ত একজন শিশু অন্তত ১৩ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে সক্ষম। এটি জীবাণুবাহিত শ্বাসনালির রোগ, যা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়।
টিকাদান কর্মসূচির বড় ধরনের বিচ্যুতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিসিজি টিকার হার সন্তোষজনক হলেও এমআর-১ এবং এমআর-২ টিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে। বিশেষ করে, ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই ৩৩ শতাংশ শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়া এক অশনিসংকেত। পুষ্টিহীনতা, মাতৃদুগ্ধ পানের অভাব এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘমেয়াদি শিথিলতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির যে ঈর্ষণীয় সাফল্য ছিল, তা আজ লজিস্টিক ও প্রশাসনিক জটিলতার আবর্তে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
টিকার মজুত শূন্য ও প্রশাসনিক জটিলতা
ফলে কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, পিসিভি ও এমআরসহ ছয়টি জরুরি টিকার মজুত শূন্যে নেমে এসেছে। টিকার মজুত কেন শূন্য হলো এবং কেন যথাসময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব হলো না, সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে। জানা গেছে, পূর্বতন স্বাস্থ্য কর্মসূচির কাঠামো পরিবর্তন ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার ফলেই ঘনীভূত হয়েছে এই সংকট। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে ৪৫ শতাংশ স্বাস্থ্য সহকারীর পদ শূন্য থাকা এবং পোর্টারদের বেতন বকেয়াজনিত অসন্তোষ টিকাদান কার্যক্রমকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও উদ্যোগ
বর্তমানে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, বিগত আট বছর যাবৎ দেশে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি কার্যকর ছিল না। সরকার এখন ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে বিশেষ ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করছে, যা ইতিবাচক হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এতগুলি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পূর্বে কেন আমাদের টনক নড়ল না? ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হামে শিশুর মৃত্যুতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি দুই মন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলাগুলি ঘুরে পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে অবকাঠামোগত সংকট
হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সংকট ও শয্যাস্বল্পতা আমাদের চিকিৎসা অবকাঠামোর কঙ্কালসার অবস্থাকেই পরিস্ফুটিত করছে। এই সংকট উত্তরণে অবিলম্বে টিকা আমদানির ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল ঢাকা নয়, প্রান্তিক জনপদগুলিতেও ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন করে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, শিশুদের জীবন নিয়ে এই প্রকার অবহেলা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও সুপারিশ
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের বড় বড় ১০টি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু করেছে। ইত্তেফাকের রিপোর্ট অনুযায়ী অন্তত ১০টি জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এই সকল জেলায় বিশেষ নজরদারি ও তদারকি করা প্রয়োজন। এখন হামসহ ১০ রোগের টিকার যে সংকট রয়েছে তা নিরসনে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কেননা এই টিকাগুলি ঠিকমতো সরবরাহ ও প্রয়োগ করা না হলে শিশুদের মধ্যে অন্য রোগও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ পোলিও ও ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একইভাবে হামকেও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ইহাতে আক্রান্তের হার ক্রমান্বয়ে নামিয়ে আনতে হবে শূন্যের কোঠায়।



