রাজশাহী বিভাগে হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি, শিশুদের উপর মারাত্মক প্রভাব
রাজশাহীতে হাম সংক্রমণ ৩১.৩০% এ, শিশুদের জন্য হুমকি

রাজশাহী বিভাগে হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে

রাজশাহী বিভাগে হামের সংক্রমণ হার বর্তমানে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২ দশমিক ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভাগের প্রতিটি জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালাচ্ছে, যেখানে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশ নমুনায় হাম পজিটিভ ফলাফল দেখা যাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) হাবিবুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নমুনা পরীক্ষার বিস্তারিত তথ্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগের ২৪৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৭ জন হাম পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত এই নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর আগে, ১৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫৩ জনের নমুনা থেকে ৪৪ জন হাম পজিটিভ রোগী পাওয়া গিয়েছিল, তখন সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ২৯ শতাংশ। পরবর্তী আট দিনে সংক্রমণ হার ২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনা জেলায় হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি বলে জানানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামের ভয়াবহ পরিস্থিতি

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত তিন মাসে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ৬ শতাধিক শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হাম রোগে আক্রান্ত ৭২ জন শিশু ভর্তি আছে, যার মধ্যে ৩৯ জন ছেলে এবং ৩৩ জন মেয়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে এবং একজনকে রাজশাহীতে রেফার্ড করা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এছাড়াও, হাসপাতালটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ১১০ জন নতুন শিশু রোগী ভর্তি হয়েছে এবং ১৪৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ১৭০ শিশু রোগী চিকিৎসাধীন আছে। রোগীর চাপ এতই বেশি যে অনেক শিশুকে শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের মেঝেতেও থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

আক্রান্ত পরিবারগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার টিকরামপুর এলাকার মলি খাতুন খাতুন বলেন, "আমার মেয়ের কিছুদিন আগে অনেক হাম বের হয়েছিল। এরপর শুক্রবার (২৭ মার্চ) থেকে অনেক জ্বর। শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে খিচুনিসহ জ্বর ছিল। পরে হাসপাতালে এসে মেয়েকে নিয়ে ভর্তি আছি। ইনজেকশন দিয়েছে, ওষুধ চলছে।" জুবায়ের আহমেদ বলেন, "শনিবার রাত সাড়ে ১০টার সময়ে আমার ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে এসেছিলাম। সেই সময়ে ছেলের অনেক জ্বর ছিল। আলহামদুলিল্লাহ এখন অনেক সুস্থতা অনুভব করছে।"

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা ও ব্যবস্থাপনা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহফুজ রায়হান বলেন, এই সিজনে তিন মাস আগে আমরা প্রথম হামের রোগী শনাক্ত করেছিলাম। সে সময়ে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি করে রোগী ভর্তি পাচ্ছিলাম, যারা মূলত নিউমোনিয়া রোগের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু পরে আমরা বুঝতে পারি এটা হাম। এরপর থেকে প্রকোপ বাড়তে থাকে। দুই মাস আগে যখন প্রকোপ বেড়ে গেল, তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে এটি আরও বেড়ে যাবে। ফলে তখন আলাদাভাবে আইসোলেশনের একটি ওয়ার্ড চালু করেছি, প্রায় ২০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড। ফ্লোরিং মিলে এই হাসপাতালে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জনকে চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা আছে।

গত একমাস থেকে এখানে ৫০-এর অধিক হামের বাচ্চা ভর্তি থাকছে। হামের প্রকোপ মারাত্মকভাবে বাড়ছে, কারণ এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ এবং অনেক বাচ্চা টিকা নেয়নি। ফলে নয় মাসের নিচের বাচ্চাগুলো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এটার মৃত্যুহারও যথেষ্ট বেশি এবং কম্পিকেশনের হারও বেশি। আমাদের সদর হাসপাতালে যে বাচ্চাগুলো ভর্তি হচ্ছে, তার মধ্যে ৯৫ ভাগ বাচ্চাকে চিকিৎসা দিতে সক্ষম। কিন্তু যেগুলো আইসিইউ লাগার মতো অবস্থা ও শ্বাসকষ্ট অতিরিক্ত হচ্ছে, অক্সিজেন ডিপেন্টডেন্ট সেই বাচ্চাগুলোকে আমরা রাজশাহীতে পাঠাচ্ছি।

গত তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে চার জন মারা গেছে: জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে একজন করে দুই জন এবং মার্চ মাসে দুই জন। গত তিন মাসে ৬ শতাধিক রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। ডা. মাহফুজ রায়হান আরও বলেন, হাম এমন একটি মারাত্মক রোগ যে ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও পরবর্তী দুই থেকে তিন মাস এই বাচ্চাগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে কমে যায়। এই কারণে হাম ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও সেই বাচ্চার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে আরও তিন মাসের বেশি সময় লাগতে পারে। এ জন্য তাদেরকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো ও তাদের প্রতি এক্সট্রা যত্ন নেওয়া দরকার।

অসুস্থতা এড়ানোর জন্য টিকা নিতে হবে। গত তিন থেকে চার বছরে অনেক বাচ্চা হামের টিকা মিস করার কারণে এই বার হামের মহামারিটি দেখা গেছে। হাম আক্রান্ত হয়ে গেলে বাচ্চাগুলোকে আইসোলেশনে রাখতে হবে, বাইরে ভিড় এড়িয়ে যেতে হবে এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বাচ্চাদেরকে যেতে না দেওয়া। এছাড়াও, গত এক সপ্তাহ থেকে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও চ্যালেঞ্জ

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, "এই মুহূর্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারাদেশে হাম রোগের সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের সদর হাসপাতালে আজকে রবিবার পর্যন্ত টোটাল রোগী ৫৭১ জন, তার মধ্যে ২৩১ জনই হচ্ছে শিশু। এর মধ্যে ৭১ জন হচ্ছে হাম রোগে আক্রান্ত। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী থাকার কথা ছিল, তার চেয়ে প্রায় আড়াইগুণ রোগী ভর্তি আছে এবং এই আড়াইগুণ রোগীর প্রায় ৪০ ভাগ হচ্ছে শিশুরোগী।"

জানুয়ারি মাসের দিকে হাম রোগী পাওয়া শুরু হলে, তাদেরকে আইসোলেশনে নিয়ে যাওয়ার কাজ করা হয়। হাসপাতালে একটি ইউনিট আছে যা কিডনি বা ডায়ালাইসিস ইউনিট হিসেবে ছিল, পরে সেই ইউনিটকে হাম ইউনিট করা হয়েছে। হাম এমন একটি রোগ যা সহজেই এক শিশু থেকে আরেক শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে, তাই তাদেরকে আলাদা করার জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই এই আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু আছে এবং তাদেরকে ভিটামিন এ সহ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

পাবনা জেলায় হামের প্রভাব

পাবনা জেলার হাসপাতালগুলোতেও হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, যেখানে শিশুর সংখ্যাই বেশি। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৭ জন, তবে এখন পর্যন্ত মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭ জন, এবং গত সাত দিনে জেলায় ২৩ জন হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১১৮ জন।

বর্তমানে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ২৭ জন রোগীর মধ্যে ৩ মাস থেকে ১২ মাস বয়সী শিশু রয়েছে ২৫ জন। মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি দুই যুবকের মধ্যে একজনের বয়স ২২ বছর অন্যজনের বয়স ৩২ বছর। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ রয়েছে যে চিকিৎসাসেবা ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না, ডাক্তার ও নার্সদের সহযোগিতা কম এবং ওষুধ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রফিকুল হাসান বলেন, "এটি ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ, শিশুসহ যেকোনও বয়সী মানুষের হাম হতে পারে। আপাতত ভর্তি করা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ায় কোনও সংকট নেই।" তবে, ৩৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন ২০০ রোগীর ওপরে ভর্তি থাকে, যা ওষুধ সরবরাহে সংকট সৃষ্টি করছে। হামের জন্য নতুন করে একটি ওয়ার্ড চালুর কথা জানানো হয়েছে।

হামের টিকা নেওয়ার পরও কেন হঠাৎ এমন প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, সে বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত করে দেখা দরকার বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, "প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুই চার জন করে হামের রোগী ভর্তি হচ্ছে। যে কারণে জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৃথক আইসোলেশন সেন্টার করা হয়েছে। ৯ মাস বা তার কম বয়সী শিশু রোগীর সংখ্যাই বেশি। যেহেতু ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়ার পরও নতুন করে হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এ বিষয়টি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।"

হাম ভীষণ ছোঁয়াচে রোগ, আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালগুলোতে অন্য শিশুদের সঙ্গেই হাম রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে, তাই হাসপাতাল থেকেও শিশুরা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকের পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। সংক্রমণ ধরা পড়ার পর তিন মাস পর শনিবার রাতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) মো. হাবিবুর রহমান জানান, হাসপাতালে হামের রোগীদের আলাদা ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। সবখানে এটা শুরুতে সম্ভব হয়নি, কিন্তু সরকারের সহযোগিতায় হামের প্রকোপ মোকাবিলায় তারা কাজ করছেন।