টিকা সংকটে হামে শিশু মৃত্যু: কেন্দ্রীয় গুদামে ৬ টিকার মজুত শূন্য
টিকা সংকটে হামে শিশু মৃত্যু, কেন্দ্রীয় গুদামে মজুত শূন্য

টিকা সংকটে হামে শিশু মৃত্যু: কেন্দ্রীয় গুদামে ছয় টিকার মজুত শূন্য

ঈদের আগে হাসপাতালে ভর্তি হয় নরসিংদী থেকে আসা ছয় মাসের শিশু মোহাম্মদ। হামে আক্রান্ত হয়ে সে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গতকাল বিকেলে তার অবস্থা গুরুতর ছিল। এই ঘটনা দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাবের একটি উদাহরণ মাত্র। চলতি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে দেশে ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ও সরকারি হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

টিকা মজুত শূন্য ও শিশু মৃত্যুর কারণ

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ায় কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমে এসেছে। বিশেষ করে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি টিকার মজুত সম্পূর্ণ ফুরিয়েছে। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে টিকার স্বল্পতা ও জনবলঘাটতির কারণে শিশু ও মায়েরা ঠিকমতো টিকা পাচ্ছে না। ফলে শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। শিশুদের মধ্যে অন্য রোগও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের টিকা কর্মসূচির সফলতা ও বর্তমান সংকট

বাংলাদেশ টিকা কর্মসূচিতে সফল দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নিয়মিত টিকাদান এবং বিভিন্ন ধরনের টিকা কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ পোলিও এবং ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। হামও অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, গাফিলতির কারণে একটি সফল কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও পদক্ষেপ

দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। যথাসময়ে টিকা সংগ্রহ করে তা দেওয়া শুরু করব।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, শিশুদের হামের চিকিৎসার জন্য সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ এবং উত্তরাঞ্চলে শিশুদের হাম মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ

টিকার সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভি বাংলাদেশকে টিকা কেনায় আর্থিক সহায়তা দেয়। গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, জনবলঘাটতি, টিকার সরবরাহ ও লজিস্টিক সংকটের পাশাপাশি নিয়মিত টিকা কর্মসূচিতে নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। শহরাঞ্চলে সব জায়গায় টিকা সমানভাবে দেওয়া হয় না। এ ছাড়া কোভিড–পরবর্তী সময়ে ড্রপ আউটের কারণে অনেক শিশু প্রথম ডোজ টিকা পেলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। এসব কারণে টিকা না পাওয়া মোট শিশু সংখ্যায় অনেক হয়েছে। এরাই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত কিছু ঝুঁকি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

জনবল–সংকট ও কর্মীদের অসন্তোষ

একদিকে টিকার সংকট, অন্যদিকে রয়েছে জনবল–সংকট। ইপিআইয়ের কর্মকর্তারা বলেন, দেশের ২৭টি জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩৭ জেলায় জনবল–সংকট প্রকট। এই ৩৭ জেলায় মাঠপর্যায়ে ৪৫ শতাংশ কর্মী নেই। মাঠপর্যায়ের এই কর্মীরা ইউনিয়নের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের টিকাকেন্দ্রে টিকা দেন। সারা দেশে এখন টিকাকেন্দ্র আছে প্রায় দেড় লাখ। বর্তমান সংকটের আরেকটি কারণ কর্মীদের মধ্যে কিছু অসন্তোষ। যেমন পোর্টাররা ৯ মাস ধরে বেতন পান না। ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ বলেন, সারা দেশে ‘পোর্টার’ আছেন ১ হাজার ৩২৬ জন। তাঁরা উপজেলা সদর থেকে বিশেষ পাত্রে করে প্রতিদিন টিকা পৌঁছে দেন টিকাকেন্দ্রে।

হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর তথ্য

শনিবার দুপুর থেকে গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত আরও দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এই হাসপাতালে চলতি মাসে হামে পাঁচটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ মাসে হামে আক্রান্ত ১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অবশ্য গত পরশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনজনের কথা বলেছিল। একই সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৃত্যু হয়েছে তিনটি শিশুর। শরীয়তপুরে হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালে। এ নিয়ে এ বছর এবং এই মাসে ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে হামে এত বেশি মৃত্যুর ঘটনা দেশে ঘটেনি।

জনস্বাস্থ্যবিদের মতামত

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হামে এত শিশুর মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। এ জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই দায়ী। কেন টিকা ফুরাল, কেন শিশুরা মারা গেল—এর অনুসন্ধান, তদন্ত হওয়া জরুরি। এটা চলতে দেওয়া যায় না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতে থাকা অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এই ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে নতুন প্রকল্প–দলিল তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়—সবকিছুতে বিলম্ব হচ্ছে।