দেশজুড়ে হামের সংক্রমণে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি: শিশু মৃত্যু ও হাসপাতালে চাপ বৃদ্ধি
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের ব্যাপক সংক্রমণে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর মহাখালী সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি চলতি বছর এখানেই ২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ১০ জেলায় এই রোগটি বেশি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বিশেষ ওয়ার্ড চালু করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ও সরকারি পদক্ষেপ
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রোববার (২৯ মার্চ) এক অনুষ্ঠানে বলেন, গত ৮ বছরে দেশে হামের টিকাদান কর্মসূচি কার্যকরভাবে চালু ছিল না। তিনি জানান, হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ৬০৪ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে এবং টিকা সংগ্রহ শেষে সারাদেশে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সংকটে ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জানান, দ্রুত ভেন্টিলেটর সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিস্থিতি ও চিকিৎসকদের মতামত
মহাখালী সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল ইত্তেফাককে বলেন, চলতি বছরের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারির শেষের দিকে হামের আউটব্রেক শুরু হয়। মার্চে সেটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং এখন সেটা সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেক হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, হাম শ্বাসনালীর রোগ এবং এটি জীবাণু বাহিত, তবে হাম কোভিডের চেয়েও বেশি ছোঁয়াছে। এই রোগ হাসি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ধারণা করছিল, আমাদের দেশে হঠাৎ একটা আউটব্রেক হতে পারে।
২০২৫ সালে সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালে বছরজুড়ে হামের রোগী ছিল ২০ থেকে ৩০ জন। আর এ বছর ২৯ মার্চ পর্যন্ত এই হাসপাতালে হামের রোগী ৫৬০ জন। এই হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ১ থেকে ৩ জন রোগী ভর্তি থাকতো, সেখানে এখন প্রতিদিন ১০০ রোগী ভর্তি হচ্ছে।
টিকাদান কর্মসূচির চ্যালেঞ্জ ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই এন্ড সার্ভির্যান্স এর উপ-পরিচালক ডা. মো. শাহারিয়ার সাজ্জাদ ইত্তেফাককে বলেন, বিসিজি টিকার ক্ষেত্রে যেমন শতভাগ বাচ্চাকে আমরা টিকা দিতে পারি। কিন্তু এমআর-১ এবং এমআর-২ টিকা বাচ্চার ৯ মাস পূর্ণ হলে একটা ডোজ দেয়া হয়, আরেকটা ১৫ মাস পূর্ণ হলে দেয়া হয়। যেকোনো কারণেই হোক সেই কাভারেজটা আমাদের একটু কম।
তিনি বলেন, ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই ৩৩ শতাংশ শিশুর হাম হচ্ছে, যা সচরাচর হয় না। আমরা প্রথম ডোজ টিকা দেই ৯ মাস পূর্ণ হলে, কিন্তু হাম তার আগেই হয়ে যাচ্ছে। এটা কেন হচ্ছে সে বিষয়ে আমাদের ট্যাকনিক্যাল বৈঠক করবে। আমরা আশা করছি, হামের এই আউটব্রেকের কারণটা বের করতে পারলে সংক্রমণ মোকাবিলা করতে পারবো।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলেই যে কোনো রোগে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এক্সক্লুসিভ ব্রেষ্টফিডিং না হওয়া একটা কারণ হতে পারে। এখন অনেক বেশি কর্মজীবী নারী আছে, যে কারণে হয়তো শিশুদের ব্রেস্টফিডিং ঠিকমত হচ্ছে না।
হাসপাতালে বিশেষ ওয়ার্ড চালু ও অবকাঠামোগত সংকট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার) পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, ঈদের কিছু আগে হামের আউটব্রেকটা হয়েছে। সারাদেশের বড় বড় ১০ টা হাসপাতালে আমরা হামের জন্যে আলাদা ওয়ার্ড চালু করেছি। এই রোগীগুলোকে অন্য রোগীদের সঙ্গে রাখা যায় না।
তার সঙ্গে, ঢাকাতে মিডফোর্ড হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, স্পেশালি ডিএনসিসি হাসপাতাল এবং মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এবং ঢাকা শিশু হাসপাতালে হামের জন্যে আলাদা করে ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা অবকাঠামো ও জনবল সংকট। তিনি জানান, সীমিত বেড ও আলাদা ওয়ার্ডের প্রয়োজনীয়তার কারণে সব রোগীকে একসঙ্গে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের পরিধি বাড়ানো এবং অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মানবিক চিত্র ও সতর্কতা
এই পরিস্থিতির মানবিক চিত্রও ভয়াবহ। মহাখালী হাসপাতালে ৮ মাসের শিশু আব্দুল্লাহ চিকিৎসাধীন। শিশুটির মা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আমরা ১৯ মার্চ থেকে বাচ্চা নিয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি। প্রথমে জ্বর, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, প্রস্রাবের ইনফেকশন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। এরপর এই হাসপাতালে আসলে জানতে পারি— আবদুল্লাহ’র হাম হয়েছে।
শিশুটির ৩ মাস বয়সে টিকা নেয়া হয়েছিল। এরপর অসুস্থতার কারণে আর টিকা নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের শিশুটিকে নিয়ে মা ও খালা উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন। আব্দুল্লাহর মতো সারাদেশে অসংখ্য শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বিশেষজরা সতর্ক করে বলেছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১৩ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার ও সচেতনতা বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।



